(১০৫:১) তুমি কি দেখনি তোমার রব হাতিওয়ালাদের সাথে কি করেছেন?
(১০৫:২) তিনি কি তাদের কৌশল ব্যর্থ করে দেননি ?
(১০৫:৩) আর তাদের ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি পাঠান ,
(১০৫:৪) যারা তাদের ওপর নিক্ষেপ করছিল পোড়া মাটির পাথর৷
(১০৫:৫) তারপর তাদের অবস্থা করে দেন পশুর খাওয়া ভূষির মতো৷
১. বাহ্যত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু মূলত এখানে শুধূ কুরাইশদেরকেই নয় বরং সমগ্র আরববাসীকেই সম্বোধন করা হয়েছে৷ তারা এই সমগ্র ঘটনা সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত ছিল৷ কুরআন মজীদের বহু স্থানে ' আলাম তারা ' ( তুমি কি দেখনি ?) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে ৷ এর মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নয় বরং সাধারণ লোকদেরকে সম্বোধন করাই উদ্দেশ্য৷ উদাহরণ স্বরূপ নিম্নোক্ত আয়াতগুলো দেখুন : ইবরাহীম ১৯ আয়াত , আল হাজ্জ ১৮ ও ৬৫ আয়াত , আন নূর ৪৩ আয়াত , লোকমান ২৯ ও ৩১ আয়াত , ফাতের ২৭ আয়াত এবং আয যুমার ২১ আয়াত ) তাছাড়া দেখা শব্দটি এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করার কারণ হচ্ছে এই যে , মক্কায় ও তার আশে পাশে এবং আরবের বিস্তৃত এলাকায় এ আসাহাবে ফীলের ঘটনাটি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছে এ ধরনের বহু লোক সে সময় জীবিত ছিল৷ কারণ তখনো এই ঘটনার পর চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ বছরের বেশী সময় অতিবাহিত হয়ে যায়নি৷ লোক মুখে প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ সরাসরি এত বেশী বেশী সূত্রে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল যার ফলে এটা প্রায় সব লোকেরই চোখে দেখা ঘটনার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল৷
২. এই হাতিওয়ালা কারা ছিল, কোথায় থেকে এসেছিল , কি উদ্দেশ্যে এসেছিল এসব কথা আল্লাহ এখানে বলছেন না৷ কারণ এগুলো সবাই জানতো ৷
৩. মূলে কাইদা ( আরবী ---------) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ কোন ব্যক্তিকে ক্ষতি করবার জন্য গোপন কৌশল অর্থে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়৷ প্রশ্ন হচ্ছে , এখানে গোপন কি ছিল ? ষাট হাজার লোকের একটি সেনাবাহিনী কয়েকটি হাতি নিয়ে প্রকাশ্যে ইয়ামন থেকে মক্কায় আসে ৷ তারা যে কা'বা শরীফ ভেঙ্গে ফেলতে এসেছে , একথাও তারা গোপন করেনি৷ কাজেই এ কৌশলটি গোপন ছিল না৷ তবে হাবশীরা কা'বা ভেঙ্গে ফেলে কুরাইশদেরকে বিধ্বস্ত করে এবং এভাবে সমগ্র আরববাসীদেরকে ভীত ও সন্ত্রন্ত করে দক্ষিণ আরব থেকে সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত বাণিজ্য পথ আরবদের কাছে থেকে ছিনিয়ে নিতে চাইছিল৷ এটা ছিল তাদের মক্কা আক্রমণের উদ্দেশ্য৷ এ উদ্দেশ্যটিকে তারা গোপন করে রাখে৷ অন্যদিকে তারা প্রকাশ করতে থাকে কয়েকজন আরব তাদের গীর্জার যে অবমাননা করেছে , কা'বা শরীফ ভেঙে ফেলে তার তার প্রতিশোধ নিতে চায়৷
৪. মূলে বলা হয়েছে ( আরবী ----------------------) অর্থাৎ তাদের কৌশলকে তিনি ভ্রষ্টতার মধ্যে নিক্ষেপ করেছেন৷ কিন্তু প্রচলিত প্রবাদ অনুযায়ী কৌশলকে ভ্রষ্টতার মধ্যে নিক্ষেপ করার মানে হয় তাকে নষ্ট ও বিধ্বস্ত করে দেয়া অথবা নিজের উদ্দেশ্য অর্জনের ক্ষেত্রে তাকে ব্যর্থ করে দেয়৷ যেমন আমরা বলি , অমুক ব্যক্তির তীর লক্ষ ভ্রষ্ট হয়েছে , তার সবচ প্রচেষ্টা ও কলাকৌশল ব্যর্থ হয়েছে৷ কুরআন মজীদের এক জায়াগায় বলা হয়েছে ( আরবী --------------) " কিন্তু কাফেরদের কলা কৌশল ব্যর্থ হয়েছে৷ ( আল মু'মিন ২৫ ) অন্য জায়গায় বলা হয়েছে : ( আরবী --------------------) " আর আল্লাহ খেয়ানতকারীদের কৌশলকে সফলতার দ্বারে পৌঁছিয়ে দেন না৷ " ( ইউসূফ ৫২) আরববাসীরা ইমরাউল কায়েসকে ( আরবী -------------) " বিনষ্টকারী বাদশাহ " বলতো ৷ কারণ সে তার বাপের কাছ থেকে পাওয়া বাদশাহী হারিয়ে ফেলেছিল৷
৫. মূলে বলা হয়েছে ( আরবী ---------------) আরবীতে আবাবীল মানে হচ্ছে , বহু ও বিভিন্ন দল যারা একের পর এক বিভিন্ন দিক থেকে আসে৷ তারা মানুষও হতে পারে আবার পশু হতে পারে ৷ ইকরামা ও কাতাদাহ বলেন , লোহিত সাগরের দিক থেকে এ পাখিরা দলে দলে আসে ৷ সাঈদ ইবনে জুবাইর ও ইকরামা বলেন , এ ধরনের পাখি এর আগে কখনো দেখা যায়নি এবং এর পরেও দেখা যায়নি৷ এগুলো নজদ , হেজায , তেহামা বা লোহিত সাগরের মধ্যবর্তী উপকূলে এলাকার পাখি ছিল না৷ ইবনে আব্বাস বলেন , তাদের চঞ্জু ছিল পাখিদের মতো এবং পাঞ্জা কুকুরের মতো৷ ইকরামার বর্ণনা মতে তাদের মাথা ছিল শিকারী পাখীর মাথার মত৷ প্রায় সকল বর্ণনাকারীর সর্বসম্মত বর্ণনা হচ্ছে , প্রত্যেকটি পাখির ঠোঁটে ছিল একটি করে পাথরে কুচি এবং পায়ে ছিল দু'টি করে পাথরের কুচি৷ মক্কার অনেক লোকের কাছে এই পাথর দীর্ঘকাল পর্যন্ত সংরক্ষিত ছিল৷ আবু নু'আইম নওফাল ইবনে আবী মু' আবীয়ার বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন৷ তিনি বলেছেন , আসহাবে ফীলের ওপর যে পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছিল আমি তা দেখেছি৷ সেগুলোর এক একটি ছিল ছোট মটর দানার সমান৷ গায়ের রং ছিল লাল কালচে৷ আবু নু'আইম ইবনে আব্বাসের যে রেওয়ায়াত উদ্ধুত করেছেন তাতে বলা হয়েছে , সেগুলো ছিল চিলগুজার * সমান৷ অন্যদিকে ইবনে মারদুইয়ার বর্ণনা মতে , সেগুলো ছিল ছাগলের লেদীর সমান৷ মোটকথা , এসবগুলো পাথর সমান মাপের ছিল না ৷ অবশ্যি কিছু না কিছু পার্থক্য ছিল৷ * চিলগুজা চীনাবাদাম জাতীয় এক ধরনের শুকনা ফল৷ লম্বায় ও চওড়ায় একটি চীনাবাদামের প্রায় সমান৷
৬. মূল শব্দগুলো হচ্ছে , ( আরবী -----------------) অর্থাৎ সিজজীল ধরনের পাথর৷ ইবনে আব্বাস বলেন , এ শব্দটি মূলত ফারসীর " সংগ" ও " গীল " শব্দ দু'টির আরবী করণ৷ * এর অর্থ এমন পাথর যা কাদা মাটি থেকে তৈরি এবং তাকে আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করা হয়েছে ৷ কুরআন মজীদ থেকে ও এই অর্থের সত্যতা প্রমাণ হয়৷ সূরা হূদের ৮২ ও সূরা হুজুরাতের ৪ আয়াতে বলা হয়েছে , লূত জাতির ওপর সিজজীল ধরনের পাথর বর্ষণ করা হয়েছিল এবং এই পাথর সম্পর্কে সূরা যারিয়াতের ৩৩ আয়াতে বলা হয়েছে , সেগুলো ছিল মাটির পাথর অর্থাৎ কাদামাটি থেকে সেগুলো তৈরি করা হয়েছিল৷

মাওলানা হামীদুদ্দিন ফারাহী মরহুম ও মগফুর বর্তমান যুগে কুরআনের অর্থ বর্ণনা ও গভীর তত্ত্ব অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন৷ তিনি এ আয়াতে " তারমীহিম " ( তাদের ওপর নিক্ষেপ করছিল) শব্দের কর্তা হিসেবে মক্কাবাসী ও অন্যান্য আরববাসীদেরকে চিহ্নিত করেছেন৷ " আলাম তারা " ( তুমি কি দেখনি ) বাক্যাংশেও তাঁর মতে এদেরকেই সম্বোধন করা হয়েছে৷ পাখিদের সম্পর্কে তিনি বলেন , তারা পাথর নিক্ষেপ করছিল না বরং তারা এসেছিল আসহাবে ফীলের লাশগুলি খেয়ে ফেলতে৷ এই ব্যাখ্যার সপক্ষে তিনি যে যুক্তি দিয়েছেন তার নির্যাস হচ্ছে এই যে , আবদুল মুত্তালিবের আবরাহার কাছে গিয়ে কা'বার পরিবর্তে নিজে উট ফেরত নেবার জন্য দাবী জানানোর ব্যাপারটি কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না৷ অন্য দিকে কুরাইশরা এবং অন্যান্য যেসব লোকেরা হজ্জের জন্য এসেছিল তারা হানাদার সেনাদলের কোন মোকাবেলা না করে কাবাঘরকে তাদের করুণা ও মেহেরবানির ওপর ছেড়ে দিয়ে নিজেরা পাহাড়ের ওপর গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় লাভ করবে , একথাও দুর্বোধ্য মনে হয়৷ তাই তাঁর মতে আসল ঘটনা হচ্ছে , আরবরা আবরাহার সেনাদলের প্রতি পাথর নিক্ষেপ করে এবং আল্লাহ পাথর বর্ষণকারী ঝড়ো বাতাস প্রবাহিত করে এই সেনাদলকে বিধ্বস্ত করেন৷ তারপর তাদের লাশ খেয়ে ফেলার জন্য পাখি পাঠান ৷ কিন্তু ভূমিকায় আমরা বলেছি , আবদুল মুত্তালিব তার উট দাবী করতে গিয়েছিলেন , রেওয়ায়াতে কেবল একথাই বলা হয়নি৷ বরং রেওয়ায়াতে একথাও বলা হয়েছে যে , আবদুল মুত্তালিব তাঁর উটের দাবীই জানাননি এবং আবরাহাকে তিনি কাবা আক্রমণ করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টাও করেছিলেন ৷ আমরা একথাও বলেছি , সমস্ত নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়াত অনুযায়ী আবরাহা মহররম মাসে এসেছিল৷ তখন হাজীরা ফিরে যাচ্ছিল আর একথাও আমরা জানিয়ে দিয়েছি যে , ৬০ হাজার সৈন্যের মোকাবেলা করা কুরাইশদের ও তাদের আশেপাশের গোত্রগুলোর সামর্থের বাইরে ছিল৷ আহযাব যুদ্ধের সময় বিরাট ঢাক ঢোল পিটিয়ে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়ে আরব মুশরিক ও ইহুদি গোত্রগুলোর যে সেনাদল তার এনেছিল তার সংখ্যা দশ বারো হাজারের বেশী ছিল না৷ কাজেই ৬০ হাজার সৈন্যের মোকাবেলা করার সাহস তারা কেমন করে করতে পারতো ? তবুও এ সমস্ত যুক্তি বাদ দিয়ে যদি শুধু মাত্র সূরা ফীলের বাক্য বিন্যাসের প্রতি দৃষ্টি দেয়া যায় তাহলে এ ব্যাখ্যা তার বিরোধী প্রমাণিত হয়৷ আরবরা পাথর মারে এবং তাতে আসহাবে ফীল মরে ছাতু হয়ে যায় আর তারপর পাখিরা আসে তাদের লাশ খাবার জন্য , ঘটনা যদি এমনি ধরা হতো তাহলে বাক্য বিন্যাস হতো নিম্নরূপভাবে :

আরবী ----------------------------------------------------------------------------------

( তোমরা তাদেরকে মারছিলে পোড়া মাটির পাথর ৷ তারপর আল্লাহ তাদেরকে করে দিলেন ভুক্ত ভূষির মতো৷ আর আল্লাহ তাদের উপর ঝাঁকে ঝঁকে পাখি পাঠালেন ) কিন্তু এখানে আমরা দেখছি , প্রথমে আল্লাহ পাখির ঝাঁক পাঠাবার কথা জানালেন তারপর তার সাথে সাথেই বললেন : ( আরবী -----------------------) অর্থাৎ যারা তাদেরকে পোড়া মাটির তৈরী পাথরের কুচি দিয়ে মারছিল৷ সবশেষে বললেন , তারপর আল্লাহ তাদেরকে ভুক্ত ভুষির মতো করে দিলেন৷

* সংগ মানে পাথর এবং গীল মানে কাদা ৷ - অনুবাদক
৭. আসল শব্দ হচ্ছে , ( আরবী ---------------------------) আসফ শব্দ সূরা আর রহমানের ১২ আয়াতে এসেছে : (আরবী -------------------------) " শস্য ভূষি ও চারাওয়ালা ৷" এ থেকে জানা যায় , আসফ মানে হচ্ছে খোসা , যা শস্য দানার গায়ে লাগানো থাকে এবং কৃষক শস্য দানা বের করে নেবার পর যাকে ফেলে দেয় তারপর পশু তা খেয়ে ও ফেলে৷ আবার পশুর চিবানোর সময় কিছু পড়েও যায় এবং তার পায়ের তলায় কিছু পিশেও যায়৷