(১০৪:১) ধবংস এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে (সামনা সামনি) লোকদের ধিক্কার দেয় এবং (পেছনে ) নিন্দা করতে অভ্যস্ত ৷
(১০৪:২) যে অর্থ জমায় এবং তা গুণে গুণে রাখে৷
(১০৪:৩) সে মনে করে তার অর্থ -সম্পদ চিরকাল থাকবে ৷
(১০৪:৪) কখনো নয়, তাকে তো চূর্ণ - বিচূর্ণকারী জায়গায় ফেলে দেয়া হবে৷
(১০৪:৫) আর তুমি কি জানো সেই চূর্ণ - বিচূর্ণকারী জায়গাটি কি ?
(১০৪:৬) আল্লাহর আগুন , প্রচণ্ডভাবে উৎক্ষিপ্ত ,
(১০৪:৭) যা হৃদয় অভ্যন্তরে পৌঁছে যাবে ৷
(১০৪:৮) তা তাদের ওপর ঢেকে দিয়ে বন্ধ করা হবে
(১০৪:৯) (এমন অবস্থায় যে তা ) উঁচু উঁচু থামে (ঘেরাও হয়ে থাকবো )৷
১. এখানে মূল শব্দ হচ্ছে (আরবী ------ ) ৷আরবী ভাষায় এই শব্দ দুটি অর্থের দিক দিয়ে অনেক বেশী কাছাকাছি অবস্থান করছে ৷ এমন কি কখনো শব্দ দুটি সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়৷ আবার কখনো দু 'য়ের পার্থক্য হয় ৷কিন্তু সে পার্থক্যটা এমন পর্যায়ের যার ফলে একদল লোক "হুমাযাহ'র যে অর্থ করে ,অণ্য একদল লোক "লুমাযা "রও সেই একই অর্থ করে আবার এর বিপরীত পক্ষে কিছু লোক "লুমাযাহ "র যে অর্থ বর্ণনা করে অন্য কিছু লোকের কাছে "হুমাযাহ"র ও অর্থ তাই এখানে যেহেতু দু'টি শব্দ এক সাথে এসেছে এবং "হুমাযাহ " ও "লুমাযাহ" শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তাই উভয় মিলে এখানে যে অর্থ দাঁড়ায় তা হচ্ছে : সে কাউকে লাঞ্ছিত ও তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে৷ কারোর প্রতি তাচ্ছিল্য ভরে অংগুলি নির্দেশ করে৷ চোখের ইশারায় কাউকে ব্যঙ্গ করে কারো বংশের নিন্দা করে৷ কারো ব্যক্তি সত্তার বিরূপ সমালোচনা করে৷ কারো মুখের ওপর তার বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করে৷ কারো পেছনে তার দোষ বলে বেড়ায় ৷ কোথাও চোখলখুরী করে এবং এর কথা ওর কানে লাগিয়ে বন্ধুদেরকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়৷ কোথাও লোকদের নাম বিকৃত করে খারাপ নামে অভিহিত করে৷ কোথাও কথার খোঁচায় কাউকে আহত করে এবং কাউকে দোষারোপ করে ৷ এসব তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে৷
২. প্রথম বাক্যটির পর এই দ্বিতীয় বাক্যটির থেকে স্বতষ্ফূর্তভাবে এ অর্থই প্রকাশিত হয় যে , নিজের অগাধ ধনদৌলতের অহংকারে সে মানুষরক এভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করে ৷ অর্থ জমা করার জন্য ( আরবী ---------------------) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এ থেকে অর্থ প্রাচুর্য বুঝা যায়৷ তারপর ' গুণে গুণে রাখা ' থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কার্পণ্য ও অর্থ লালসার ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে৷
৩. এর আর একটি অর্থ হতে পারে৷ তা হচ্ছে এই যে , সে মনে করে তার অর্থ - সম্পদ তাকে চিরন্তন জীবন দান করবে৷ অর্থাৎ অর্থ জমা করার এবং তা গুণে রেখে দেবার কাজে সে এত বেশী মশগুল যে নিজের মৃত্যুর কথা তার মনে নেই৷ তার মনে কখনো এ চিন্তার উদয় হয় না যে , এক সময় তাকে এসব কিছু ছেড়ে দিয়ে খালি হাতে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে৷
৪. মূলে হুতামা ( আরবী ------) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর মূল হাতম ( আরবী -----) ৷ হাতম মানে ভেঙ্গে ফেলা , পিষে ফেলা ও টুকরা টুকরা করে ফেলা ৷ জাহান্নামকে হাতম নামে অভিহিত করার কারণ হচ্ছে এই যে , তার মধ্যে যা কিছু ফেলে দেয়া হবে তাকে সে নিজের গভীরতা ও আগুনের কারণে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে রেখে দেবে৷
৫. আসলে বলা হয়েছে ( আরবী ---------) ৷ আরবী ভাষায় কোন জিনিসকে তুচ্ছ ও নগণ্য মনে করে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া অর্থে ( আরবী ------) শব্দটি ব্যবহার করা হয়৷ এ থেকে আপনা আপনি এই ইংগিত সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে , নিজের ধনশালী হওয়ার করণে সে দুনিয়ায় নিজেকে অনেক বড় কিছু মনে করে৷ কিন্তু কিয়ামতের দিন তাকে ঘৃণাভরে জাহান্নামে ছুঁড়ে দেয়া হবে৷
৬. কুরআন মজীদের একমাত্র এখানে ছাড়া আর কোথাও জাহান্নামের আগুনকে আল্লাহর আগুন বলা হয়নি৷ এখানে এই আগুনকে আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত করার মাধ্যমে কেবলমাত্র এর প্রচণ্ডতা ও ভয়াবহতারই প্রকাশ হচ্ছে না৷ বরং এই সংগে এও জানা যাচ্ছে যে , দুনিয়ার ধন - সম্পদ লাভ করে যারা অহংকার ও আত্মম্ভরিতায় মেতে ওঠে তাদেরকে আল্লাহ কেমন প্রচণ্ড ঘৃণা ও ক্রোধের দৃষ্টিতে দেখে থাকেন৷ এ কারণেই তিনি জাহান্নামের এই আগুনকে নিজের বিশেষ আগুন বলেছেন এবং এই আগুনেই তাকে নিক্ষেপ করা হবে৷
৭. আসল বাক্যটি হচ্ছে , ( আরবী -----------) ' এখানে তাত্তালিউ ' ( আরবী -------- ) শব্দটির মূলে হচ্ছে ' ইত্তিলা ' ( আরবী -------) ' ইত্তিলা ' এর একটি অর্থ হচ্ছে চড়া , আরোহণ করা ও ওপরে পৌঁছে যাওয়া ৷ এর দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে , অবগত হওয়া ও খবর পাওয়া ৷ আফইদাহ ( আরবী -----------) হচ্ছে বহুবচন৷ এর একবচন ফুওয়াদ ( আরবী --------------) এর মানে হৃদয়৷ কিন্তু বুকের মধ্যে যে হৃদপিণ্ডটি সবসময় ধুক ধুক করে তার জন্যও ফুওয়াদ শব্দটি ব্যবহার করা হয় না৷ বরং মানুষের চেতনা , জ্ঞান , আবেগ , আকাংক্ষা , চিন্তা , বিশ্বাস , সংকল্প ও নিয়তের কেন্দ্রস্থলকেই এই শব্দটি দিয়ে প্রকাশ করা হয়৷ হৃদয় পর্যন্ত এই আগুন পৌঁছবার একটি অর্থ হচ্ছে এই যে , এই আগুন এমন জায়গায় পৌঁছে যাবে যেখানে মানুষের অসৎচিন্তা , ভুল আকীদা - বিশ্বাস , অপবিত্র ইচ্ছা , বাসনা , প্রবৃত্তি , আবেগ এবং দুষ্ট সংকল্প ও নিয়তের কেন্দ্র৷ এর দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে , আল্লাহর এই আগুন দুনিয়ার আগুনের মতো অন্ধ হবে না৷ সে দোষী ও নির্দোষ সবাইকে জ্বালিয়ে দেবে না৷ বরং প্রত্যেক অপরাধীর হৃদয় অভ্যন্তরে পৌঁছে সে তার অপরাধের প্রকৃতি নির্ধারণ করবে এবং প্রত্যেককে তার দোষ ও অপরাধ অনুযায়ী আযাব দেবে৷
৮. অর্থাৎ অপরাধীদেরকে জাহান্নামের মধ্যে নিক্ষেপ করে ওপর থেকে তা বন্ধ করে দেয়া হবে৷ কোন দরজা তো দূরের কথা তার কোন একটি ছিদ্রও খোলা থাকবে না৷
৯. ফি আমাদিম মুমাদ্দাদাহ ( আরবী --------) এর একাধিক মানে হতে পারে৷ যেমন এর একটি মানে হচ্ছে , জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দিয়ে তার ওপর উঁচু উঁচু থাম গেঁড়ে দেয়া হবে ৷ এর দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে,এই অপরাধীরা উঁচু উঁচু থামের গায়ে বাঁধা থাকবে৷ এর তৃতীয় অর্থ ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেন , এই আগুনের শিখাগুলো লম্বা লম্বা থামের আকারে ওপরের দিকে উঠতে থাকবে৷