(১০১:১) মহাদুর্ঘটনা !
(১০১:২) কী সেই মহাদুর্ঘটনা ?
(১০১:৩) তুমি কী জানো সেই মহাদুর্ঘটনাটি কি ?  
(১০১:৪) সেদিন যখন লোকেরা ছড়িয়ে থাকা পতংগের মতো
(১০১:৫) এবং পাহাড়গুলো রং বেরঙের ধূনা পশমের মতো হবে৷
(১০১:৬) তারপর যার পাল্লা ভারী হবে
(১০১:৭) সে মনের মতো সুখী জীবন লাভ করবে  
(১০১:৮) আর যার পাল্লা হালকা হবে
(১০১:৯) তার আবাস হবে গভীর খাদ৷
(১০১:১০) আর তুমি কী জানো সেটি কি ?
(১০১:১১) ( সেটি )জ্বলন্ত আগুন৷
১. কুরআনের মূল শব্দ হচ্ছে " কা-রিআহ " ( আরবী ---) এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে , " যে ঠোকে " ৷ কারা ' আ ( আরবী --------) মানে কোন জিনিসকে কোন জিনিসের ওপর এমন জোরে মারা যার ফলে তা থেকে প্রচণ্ড আওয়াজ হয়৷ এই শাব্দিক অর্থের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও বড় রকমের মারাত্মক বিপদের ক্ষেত্রে " কারি' আহ " শব্দ বলা হয়ে থাকে৷ যেমন আরবরা বলে , ( আরবী ------) অর্থাৎ উমুক উমুক পরিবার ও গোত্রের লোকদের ওপর ভয়াবহ বিপদ নেমে এসেছে৷ কুরআন মজীদের এসব জায়গায়ও এই শব্দটি কোন জাতির ওপর বড় ধরনের মুসিবত নাযিল হবার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে৷ সূরা রা ' আরদ বলা হয়েছে : ( আরবী --------------------------------------) "যারা কুফরী করেছে তাদের ওপর তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে কোন না কোন বিপদ নাযিল হতে থাকে৷ " ( ৩১ আয়াত ) কিন্তু এখানে " আল কারি' আহ " শব্দটি কিয়ামতের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে৷ আবার সূরা আল হা - ক্কায় কিয়ামতকে এই শব্দটি দিয়েই চিহ্নিত করা হয়েছে ৷ ( আয়াত ৪ ) এখানে একথাটিও সামনে রাখতে হবে যে , এখানে কিয়ামতের প্রথম পর্যায় থেকে নিয়ে শেষ পর্যায় পর্যন্ত পুরো আখেরাতের আলোচনা একসাথে করা হচ্ছে৷
২. এ পর্যন্ত কিয়ামতের প্রথম পর্যায়ের আলোচনা চলেছে৷ অর্থাৎ যখন মহাদুর্ঘটনা ঘটে যাবে ৷ আর এর ফলে সারা দুনিয়ার ব্যবস্থাপনা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে, লোকেরা আতংকগ্রস্ত হয়ে এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করতে থাকবে যেমন আলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া পতংগরা চারদিকে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে ৷ পাহাড়গুলো রং বেরঙের ধূনা পশমের মতো উড়তে থাকবে ৷ পাহাড়গুলোর রং বিভিন্ন হওয়ার কারণে আসলে তাদেরকে রং বেরঙের পশমের সাথে তুলনা করা হয়েছে৷
৩. এখান থেকে কেয়ামতের দ্বিতীয় পর্যায় আলোচনা শুরু হয়েছে৷ লোকেরা পূর্নবার জীবিত হয়ে আল্লাহ আদালতে হাযির হবার পর থেকে এই পর্যায়টি শুরু৷
৪. মূলে মাওয়াযীন ( আরবী -----------) ব্যবহার করা হয়েছে৷ এ শব্দটি মাওযূন ( আরবী ------) এর বহুবচন হতে পারে৷ আবার মীযান ( আরবী ) এরও বহুবচন হতে পারে৷ যদি এটি মাওযুনের বহুবচন হয়ে তাহলে " মাওয়াযীন " অর্থ হবে এমন ধরনের কর্মকাণ্ড , আল্লাহর দৃষ্টিতে যার কোন ওজন আছে এবং যা তাঁর কাছে কোন ধরনের মর্যাদালাভের যোগ্যতা রাখে৷ আর যদি একে মীযানের বহুবচন গণ্য করা হয তাহলে মাওয়াযীন অর্থ হবে দাঁড়িপাল্লার পাল্লা৷ প্রথম অবস্থায় মাওয়াযীনের ভারী বা হালকা হবার মানে হবে অসৎকর্মের মোকাবিলায় সৎকর্মের ভারী বা হালকা হওয়া ৷ কারণ আল্লাহর দৃষ্টিতে কেবলমাত্র সৎকাজই ভারী ও মূল্যবান৷ দ্বিতীয় অবস্থায় মাওয়াযীনের ভারী হাবার মানে হয় মহান আল্লাহর আদালতে নেকীর পাল্লা পাপের পাল্লার তুলনায় বেশী ভারী হওয়া৷ আর এর হালকা হাবার মানে হয় নেকীর পাল্লা পাপের পাল্লার তুলনায় হালকা হওয়া ৷ এছাড়া আরবী ভাষায় মীযান শব্দ ওজন অর্থেও ব্যবহৃত হয়৷ আর এই অর্থের দৃষ্টিতে ওজনের ভারী ও হালকা হবার মানে হয় নেকীর ওজন ভারী বা হালকা হওয়া ৷ যাহোক মাওয়াযীন শব্দটি মাওযূন , মীযান বা ওজন যে কোন অর্থেই ব্যবহার করা হোক না কেন সব অবস্থায় প্রতিপাদ্য একই থাকে এবং সেটি হচ্ছে : মানুষ আমলের যে পুঁজি নিয়ে আল্লাহর আদালতে আসবে তা ভারী না হালকা , অথবা মানুষের নেকী তার পাপের চেয়ে ওজনে বেশী না কম এরি ভিত্তিতে সেখানে ফায়সালা অনুষ্ঠিত হবে৷ এ বিষয়টি কুরআনের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখিত হয়েছে৷ সেগুলো সব সামনে রাখলে এর অর্থ পুরোপুরি অনুধাবন করা সম্ভব হবে৷ সূরা আরাফে বলা হয়েছে : " আর ওজন হবে সেদিন সত্য ৷ তারপর যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই সফলকাম হবে ৷ আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারাই নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে৷ " ( ৮-৯ আয়াত ) সূরা কাহাফে বলা হয়েছে : " হে নবী ! এই লোকদেরকে বলে দাও , আমি কি তোমাদের জানাবো নিজেদের আমলের ব্যপারে সবচেয়ে বেশী ব্যর্থ কারা ? তারাই ব্যর্থ যাদের দুনিয়ার জীবনে সমস্ত কর্মকাণ্ড সত্য সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত থেকেছে এবং যারা মনে করতে থেকেছে , তারা সবকিছু ঠিক করে যাচ্ছে ৷ এই লোকেরাই তাদের রবের আয়াত মানতে অস্বীকার করেছে এবং তাঁর সামনে হাযির হওয়ার বিষয়টি বিশ্বাস করেনি৷ তাই তাদের সমস্ত আমল নষ্ট হয়ে গেছে৷ কিয়ামতের দিন আমি তাদের কোন ওজন দেবো না৷ " ( ১০৪-১০৫ আয়াত ) সূরা আম্বিয়ায় বলা হয়েছে : " কিয়ামতের দিন আমি যথাযথ ওজন করার দাঁড়িপাল্লা রেখে দেবো৷ তারপর কারো ওপর অণু পরিমাণও জুলুম হবে না৷ যার সরিষার দানার পরিমাণও কোন কাজ থাকবে তাও আমি সামনে আনবো এবং হিসেব করার জন্য আমি যথেষ্ট৷" ( ৪৭ আয়াত ) এই আয়াতগুলো থেকে জানা যায় , কুফরী করা এবং সত্যকে অস্বীকার করা বৃহত্তম অসৎকাজের অন্তরভুক্ত৷ গুনাহের পাল্লা তাতে অনিবার্যভাবে ভারী হয়ে যায়৷ আর কাফেরের এমন কোন নেকী হবে না নেকীর পাল্লায় যার কোন ওজন ধরা পড়ে এবং তার ফলে পাল্লা ঝুঁকে পড়তে পারে৷ তবে মু'মিনের পাল্লায় ঈমানের ওজনও হবে এবং এই সংগে সে দুনিয়ায় যেসব নেকী করেছে সেগুলোর ওজনও হবে৷ অন্যদিকে তার সমস্ত গোনাহ গোনাহর পাল্লায় রেখে দেয়া হবে৷ তারপর নেকীর পাল্লা ঝুঁকে আছে গোনাহর পাল্লা ঝুঁকে আছে , তা দেখা হবে৷
৫. মূল শব্দ হচ্ছে ( আরবী ) " তার মা হবে হাবিয়া৷" হাবিয়া ( আরবী -----) শব্দটি এসেছে হাওয়া ( আরবী ---) থেকে৷ এর অর্থ হচ্ছে উঁচু জায়গা থেকে নীচুতে পড়ে যাওয়া ৷ আর যে গভীর গর্তে কোন জিনিস পড়ে যায় তাকে হাবিয়া বলে৷ জাহান্নামকে হাবিয়া বলার কারণ হচ্ছে এই যে , জাহান্নাম হবে অত্যন্ত গভীর এবং জাহান্নামবাসীদেরকে তার মধ্যে ওপর থেকে নিক্ষেপ করা হবে ৷ আর তার মা হবে জাহান্নাম একথা বলার অর্থ হচ্ছে এই যে , মায়ের কোল যেমন শিশুর অবস্থান হয় তেমনি জাহান্নমবাসীদের জন্য জাহান্নাম ছাড়া আর কোন অবস্থান হবে না৷
৬. অর্থাৎ সেটি শুধুমাত্র একটি গভীর খাদ হবে না বরং জ্বলন্ত আগুনেও পরিপূর্ণ হবে৷