(১০০:১) কসম সেই (ঘোড়া ) গুলোর যারা হ্রেষারব সহকারে দৌড়ায়৷
(১০০:২) তারপর (খুরের আঘাতে) আগুনের ফুলকি ঝরায়৷
(১০০:৩) তারপর অতর্কিত আক্রমণ চালায় প্রভাতকালে৷
(১০০:৪) তারপর এ সময় ধূলা উড়ায় 
(১০০:৫) এবং এ অবস্থায় কোন জনপদের ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে৷ 
(১০০:৬) আসলে মানুষ তার রবের প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ৷
(১০০:৭) আর সে নিজেরই এর সাক্ষী৷
(১০০:৮) অবশ্য সে ধন দৌলতের মোহে খুব বেশী মত্ত৷
(১০০:৯) তবে কি সে সেই সময়ের কথা জানে না যখন কবরের মধ্যে যা কিছু ( দাফন করা ) আছে সেসব বের করে আনা হবে
(১০০:১০) এবং বুকের মধ্যে যা কিছু ( লুকানো ) আছে সব বের করে এনে যাচাই করা হবে ?
(১০০:১১) অবশ্য সেদিন তাদের রব তাদের সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত থাকবেন৷
১. দৌড়ায় শব্দের মাধ্যমে যে এখানে ঘোড়া বুঝানো হয়েছে আয়াতে শব্দগুলো থেকে একথা মোটেই স্পষ্ট নয়৷ বরং এখানে শুধু বলা হয়েছে ( আরবী -----------) অর্থাৎ " কসম তাদের যারা দৌড়ায় ৷ " এ কারণে কারা দৌড়ায় এর ব্যাপারে মুফাসসিরগণের মধ্যে বিভিন্ন মতের সৃষ্টি হয়েছে৷ সাহাবী ও তাবেঈগণের একটি দল বলেছেন , ঘোড়া এবং অন্য একটি দল বলেছেন উট৷ কিন্তু যেহেতু দৌড়াবার সময় বিশেষ আওয়াজ , যাকে ( আরবী ---------) ( হ্রেষারব ) বলা হয় , একমাত্র ঘোড়ার মুখ দিয়েই দ্রুত শ্বাস- প্রশ্বাস চলার কারণে বের হয় এবং পরের আয়াতগুলোতে অগ্নি ষ্ফুলিংগ ঝরাবার , খুব সকালে কোন জনপদে অতর্কিত আক্রমণ চালাবার এবং সেখানে ধূলা উড়াবার কথা বলা হয়েছে , আর এগুলো একমাত্র ঘোড়ার সাথেই খাপ খায় , তাই অধিকাংশ গবেষক একে ঘোড়ার সাথে সংশ্লিষ্ট করেছেন৷ ইবনে জারীর বলেন , " এ ব্যাপারে যে দু'টি বক্তব্য পাওয়া যায় তার মধ্যে ঘোড়া দৌড়ায় এই বক্তব্যটি অগ্রাধিকার লাভের যোগ্য৷ কারণ উট হ্রেষারব করে না , ঘোড়া হ্রেষারব করে৷ আর আল্লাহ বলেছেন , যারা হ্রেষারব করে দৌড়ায় তাদের কসম৷ " ইমাম রাজী বলেন , " এই আয়াতগুলোর বিভিন্ন শব্দ চিৎকার করে চলছে , এখানে ঘোড়ার কথা বলা হয়েছে৷ কারণ ঘোড়া ছাড়া আর কেউ হ্রেষারব করে না৷ আর আগুনের ষ্ফুলিংগ ঝরাবার কাজটিও পাথরের ওপর ঘোড়ার খুরের আঘাতেই সম্পন্ন হয়৷ এ ছাড়া অন্য কোন ভাবেই তা হতে পারে না৷ অন্য দিকে খুব সকালে আক্রমণ চালাবার কাজটিও অন্য কোন প্রাণীর তুলনায় ঘোড়ার সাহায্যে সম্পন্ন করাই সহজতর হয়৷ "
২. আগুনের ফুলকি ঝরায় ইত্যাকার শব্দগুলো একথাই প্রকাশ করে যে , রাত্রিকালে ঘোড়া দৌড়ায় ৷ কারণ তাদের পায়ের খুর থেকে যে আগুনের ফুলকি ঝরে তার রাতের বেলায়ই দেখতে পাওয়া যায়৷
৩. আরববাসীদের নিয়ম ছিল , কোন জনপদে অতর্কিত আক্রমণে করতে হলে তারা রাতের আঁধারে বের হয়ে পড়তো ৷ এর ফলে শত্রুপক্ষ পূর্বোহ্নে সতর্ক হতে পারতো না৷ এভাবে একেবারে খুব সকালে তাদের ওপর ঝঁপিয়ে পড়তো৷প্রভাতে আলো যেটুকু ছড়িয়ে পড়তো তাতে তারা সবকিছু দেখতে পেতো৷আবার দিনের আলো খুব বেশী উজ্জ্বল না হবার কারণে প্রতিপক্ষ দূর থেকে তাদের আগমন দেখতে পেতো না ৷ ফলে তারা মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতিও জন্য গ্রহণ করতে পারতো না৷
৪. রাতের বেলা হ্রেষারব করে আগুনের ফুলকি ঝরাতে ঝরাতে যেসব ঘোড়া দৌড়ায় , তারপর খুব সকালে ধূলি উড়িয়ে কোন জনপদে চড়াও হয় এবং প্রতিরোধকারীদের ভীড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে ,সেসব ঘোড়ার কসম খাওয়া হয়েছে যে কথাটি বলার জন্য এটিই সেই কথা৷ অধিকাংশ তফসীরকার এই ঘোড়া বলতে যে ঘোড়া বুঝিয়েছেন তা দেখে অবাক হতে হয়৷ জিহাদকারী গাযীদের ঘোড়াকে তারা এই ঘোড়া বলে চিহ্নিত করেছেন এবং যে ভীড়ের এই ঘোড়া মধ্যে এই ঘোড়া প্রবেশ করে তাকে তারা কাফেরদের সমাবেশ মনে করেছেন৷ অতছ "মানুষ তার রবের প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ "এ কথাটির ওপরই কসম খাওয়া হয়েছে ৷একথা সুস্পষ্ট ,আল্লাহর পথে জিহাদকারী গাযীদের ঘোড়ার দৌড়াদৌড়ি এবং কাফেরদের কোন দলের ওপর তাদের ঝাঁপিয়ে পড়ায় একথা বুঝায় না যে মানুষ তার রবের প্রতি অকৃতজ্ঞ ৷ আর মানুষ নিজেই তার এই অকৃতজ্ঞতার সাক্ষী এবং সে ধন দৌলতের মোহে বিপুলভাবে আক্রান্ত এই পরবর্তী বাক্যগুলোও এমন সব লোকদের সাথে খাপ খায় না যারা আল্লাহর পথে জিহাদ করতে বের হয়৷ তাই নিশ্চিতভাবে একতা মেনে নিতে হবে যে , এই সূরার প্রথম পাঁচটি আয়াতে যে কসম খাওয়া হয়েছে তা সে সময়ের আরবে সাধারণভাবে যে লুঠতরাজ , হত্যাকাণ্ড ও রক্তপাত চলছিল সেদিকেই ইংগিত করছে৷ জাহেলী যুগে রাতগুলো হতো বড়ই ভয়াবহ৷ প্রত্যেক গোত্র ও জনপদের লোকেরা আশংকা করতো , না জানি রাতের আঁধারে তাদের ওপর কোন দুশমন চড়াও হবার জন্য ছুটে আসছে৷ আর দিনের আলো প্রকাশিত হবার সাথ সাথে তারা নিশ্চিন্ত হতো৷ কারণ রাতটা নির্ঝনঝাটে ও ভালোয় ভালোয় কেটে গেছে৷ সেখানে গোত্রে গোত্রে কেবলমাত্র প্রতিশোধমূলক লড়াই হতো না৷ বরং এক গোত্র আর এক গোত্রের ওপর আক্রমণ চালাতো তার ধন - দৌলত লুটে নেবার , তার উট , ভেড়া ইত্যাদি পশু কেড়ে নেবার এবং তার মেয়েদের ও শিশুদের গোলাম বানাবার জন্য৷ এসব লুটতরাজ ও জুলুম নিপীড়ন করা হতো সাধারণত ঘোড়ায় চড়ে৷ মানুষ যে তার রবের প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ এই বক্তব্যের সপক্ষে এ বিষয়গুলোকে আল্লাহ প্রমাণ হিসেবে পেশ করেছেন ৷ অর্থাৎ যে শক্তিকে তারা ব্যয় করছে লুটতরাজ , হানাহানি , খুন - খারাবি ও যুদ্ধ - বিগ্রহের জন্য সে শক্তি তো আল্লাহ তাদেরকে মূলত এ কাজে ব্যয় করার জন্য দেননি৷ কাজেই আল্লাহর দেয়া এ উপকরণ ও শক্তিগুলোকে আল্লাহর সবচেয়ে বেশী অপ্রিয় , যে দুনিয়ায় বিপর্যয় সৃষ্টি করা তার পিছনে ব্যয় করা তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় অকৃতজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়৷
৫. অর্থাৎ তার বিবেক এর সাক্ষী ৷ আবার অনেক কাফের নিজ মুখেই প্রকাশ্যে এই অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে৷ কারণ তাদের মতে আদতে আল্লাহর কোন অস্তিত্বই নেই৷ সে ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতি তাঁর কোন অনুগ্রহের স্বীকৃতি দেয়া এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে অপরিহার্য করার কোন প্রশ্নই ওঠে না৷
৬. কুরআনের মূল শব্দগুলো হচ্ছে : ( আরবী ---------------------------) এর শাব্দিক তরজমা হচ্ছে , " সেই ভালোয় প্রতি গভীর ভালোবাসা পোষন করে ৷ " কিন্তু আরবী ভাষায় ' খাইর " শব্দটি কেবলমাত্র ভালো ও নেকীর প্রতিশব্দ হিসেবেই ব্যবহৃত হয় না বরং ধন - দৌলত অর্থেও এর ব্যবহার প্রচলিত৷ সূরা আল বাকারার ১৮০ আয়াতে " খাইর " শব্দটি ধন সম্পদ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে৷ বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ও পরিবেশ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে কোথায় এ শব্দটি নেকী অর্থে এবং কোথায় ধন - সম্পদ অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে তা অনুধাবন করা যায়৷ এই আয়াতটির পূর্বাপর আলোচনা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হচ্ছে যে , এখানে " খাইর " বলতে ধন সম্পদ বুঝানো হয়েছে , নেকী বুঝানো হয়নি৷ কারণ যে ব্যক্তি নিজের রবের প্রতি অকৃতজ্ঞ এবং নিজের কার্যকলাপের মাধ্যমে নিজের অকৃতজ্ঞতার সপক্ষে সাক্ষ পেশ করছে তার ব্যাপারে কখনো একথা বলা যেতে পারে না যে , সে নেকী ও সৎবৃত্তির প্রতি গভীর ভালোবাসা পোষণ করে৷
৭. অর্থাৎ মরা মানুষ যেখানে যে অবস্থায় আছে সেখান থেকে তাকে বের করে এনে জীবিত মানুষের আকারে দাঁড় করানো হবে৷
৮. অর্থাৎ বুকের মধ্যে যেমন ইচ্ছ ও নিয়ত , স্বার্থ ও উদ্দেশ্য , চিন্তা , ভাবধারা এবং বাহ্যিক কাজের পেছনে যেসব গোপন অভিপ্রায় লুকিয়ে আছে সেসব খুলে সামনে রেখে দেয়া হবে৷ সেগুলো যাচাই করে ভালো ও খারাপগুলোকে আলাদা আলাদা করে দেয়া হবে৷ অন্য কথায় শুধুমাত্র বাইরের চেহারা দেখে মানুষ বাস্তবে যা কিছু করেছে সে সম্পর্কে শেষ সিদ্ধান্ত শুনিয়ে দেয়া হবে না৷ বরং মনের মধ্যে লুকানো রহস্যগুলোকে বাইরে বের করে এনে দেখা হবে যে , মানুষ যেসব কাজ করেছে তার পেছনে কি উদ্দেশ্য ও স্বার্থ - প্রেরণা লুকিয়েছিল ৷ এ বিষয়টি চিন্তা করলে মানুষ একথা স্বীকার না করে পারে না যে , আসল ও পূর্ণাংগ ইনসাফ একমাত্র আল্লাহর আদালতে ছাড়া আর কোথাও কায়েম হতে পারে না৷ নিছক বাইরের কাজকর্ম দেখে কোন ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া যায় না বরং কি উদ্দেশ্যে সে এ কাজ করেছে তাও দেখতে হবে৷ দুনিয়ার ধর্মহীন আইন ব্যবস্থাগুলোও নীতিগতভাবে একথা জরুরী মনে করে৷ তবে নিয়ত ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনুসন্ধান চালিয়ে তার সঠিক চেহারা সনাক্ত করার মতো উপকরণ দুনিয়র কোন আদালতেরও নেই৷ একমাত্র আল্লাহই এ কাজ করতে পারেন একমাত্র তিনিই মানুষের প্রত্যেকটি কাজের বাইরের চেহারার পেছনে যে গোপন প্রেরণা ও উদ্দীপনা সক্রিয় থাকে তা যাচাই করে সে কোন ধরনের পুরস্কার বা শাস্তির অধিকারী হতে পারে তা নির্ধারণ করতে পরেন৷ তাছাড়া আয়াতের শব্দাবলী থেকে একথা সুস্পষ্ট যে মনের ভেতরে, ইচ্ছা , সংকল্প ও নিয়ত সম্পর্কে আল্লাহ পূর্বাহ্নেই যে জ্ঞান রাখেন নিছক তার ভিত্তিতে এ ফায়সালা হবে না৷ বরং কিয়ামতের দিন এ রহস্যগুলো উন্মুক্ত করে সবার সামনে রেখে দেয়া হবে এবং প্রকাশ্য আদালতে যাচাই ও পর্যালোচনা করে এর কতটুকু ভালো ও কতটুকু খারাপ ছিল তা দেখিয়ে দেয়া হবে৷ এজন্য এখানে ( আরবী ------------------------) বলা হয়েছে৷ কোন জিনিসকে বের করে বাইরে নিয়ে আসাকে ' হুসসিলা ' বা ' তাহসীল ' বলে ৷ যেমন , বাইরের ছাল বা খোসা ছড়িয়ে ভেতরের মগজ বের করা৷ এভাবে বিভিন্ন ধরনের জিনিসকে ছেটে পরস্পর থেকে আলাদা করার জন্যও এ শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে৷ কাজেই মনের মধ্যে লুকানো রহস্যসমূহের ' তাহসীল ' বা বের করে আনার মধ্যে এ দু'টি অর্থ শামিল হবে৷ সেগুলোকে খুলে বাইরে বের করে দেয়াও হবে আবার সেগুলো ছেটে ভালো ও মন্দ আলাদা করে দেয়াও হবে৷ এ বক্তব্যটিই সুরা আত তারিকে এভাবে বলা হয়েছে : ( আরবী ------------------) " যেদিন গোপন রহস্য যাচাই বাছাই করা হবে৷ " ( ৯ আয়াত )
৯. অর্থাৎ কে কি এবং কে কোন ধরনের শাস্তি বা পুরস্কারের অধিকারী তা তিনি খুব ভালোভাবেই জানবেন৷