(১০:৮৩) (তারপর দেখো) মুসাকে তার কওমের কতিপয় নওজোয়ান ৭৮ ছাড়া কেউ মেনে নেয়নি, ৭৯ ফেরাউনের ভয়ে এবং তাদের নিজেদেরই কওমের নেতৃস্থানীয় লোকদের ভয়ে৷ (তাদের আশংকা ছিল) ফেরাউন তাদের ওপর নির্যাতন চালাবে৷ আর প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে এই যে, ফেরাউন দুনিয়ায় পরাক্রমশালী ছিল এবং সে এমন লোকদের অন্তরভুক্ত ছিল যারা কোন সীমানা মানে না৷ ৮০
(১০:৮৪) মুসা তার কওমকে বললো, হে লোকেরা! যদি তোমরা সত্যিই আল্লাহর প্রতি ঈমান রেখে থাকো তাহলে তার ওপর ভরসা করো, যদি তোমরা মুসলিম -আত্মসমপূর্ণকারী হও৷ ৮১
(১০:৮৫) তারা জবাব দিল, আমরা আল্লাহরই ওপর ভরসা করলাম্৷ হে আমাদের রব! আমাদেরকে জালেমদের নির্যাতনের শিকারে পরিণত করো না৷৮২
(১০:৮৬) এবং তোমার রহমতের সাহায্যে কাফেরদের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করো৷ ৮৩
(১০:৮৭) আর আমি মূসা ও তার ভাইকে ইশারা করলাম এই বলে যে, মিসরে নিজের কওমের জন্য কতিপয় গৃহের সংস্থান করো, নিজেদের ঐ গৃহগুলোকে কিবলায় পরিণত করো এবং নামায কায়েম করো৷ ৮৪ আর ঈমানদারদেরকে সুখবর দাও৷ ৮৫
(১০:৮৮) মুসা ৮৬ দোয়া করলো, হে আমাদের রব! তুমি ফেরাউন ও তার সরদারদেরকে দুনিয়ার জীবনের শোভা -সৌন্দর্য ৮৭ ও ধন-সম্পদ ৮৮ দান করেছো৷ হে আমাদের রব! একি এ জন্য যে, তারা মনুষকে তোমার পথ থেকে বিপথে সরিয়ে দেবে? হে আমাদের রব! এদের ধন-সম্পদ ধ্বংস করে দাও এবং এদের অন্তরে এমনভাবে মোহর মেরে দাও যাতে মর্মন্তুদ শাস্তি ভোগ না করা পর্যন্ত যেন এরা ঈমান না আনে ৮৯
(১০:৮৯) আল্লাহ জবাবে বললেন, ,তোমাদের দুজনের দোয়া কবূল করা হলো৷ তোমরা দুজন অবিচল থাকো এবং মুর্খতাদের পথ কখনো অনুসরণ করো না৷৯০
(১০:৯০) আর আমি বনী ইসরাঈলকে সাগর পার করে নিয়ে গেলাম৷ তারপর ফেরাউন ও তার সেনাদল জুলূম নির্যতন ও সীমালংঘন করার উদ্দেশ্য তাদের পেছনে চললো৷ অবশেষে যখন ফেরাউন ডুবতে থাকলো তখন বলে উঠলো, আমি মেনে নিলাম, নবী ইসরাঈল যার উপর ঈমান এনেছে তিনি ছাড়া আর কোন প্রকৃত ইলাহ নেই, এবং আমিও আনুগত্যের শির নতকারীদের অন্তরভুক্ত৷ ৯১
(১০:৯১) (জবাব দেয়া হলো) এখন ঈমান আনছো! অথচ এর আগে পর্যন্ত তুমি নাফরমানী চালিয়ে এসেছো এবং তুমি বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের একজন ছিলে৷
(১০:৯২) এখন তো আমি কেবল তোমার লাশটাকেই রক্ষা করবো যাতে তুমি পরবর্তীদের জন্য শিক্ষনীয় নিদর্শন হয়ে থাকো৷ ৯২ যদিও অনেক মানুষ এমন আছে যারা আমার নিদর্শনসমূহ থেকে উদাসীন৷ ৯৩
৭৮. কুরআনের মূল বাক্যে ---------(যুররিয়াতুন) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ এর মানে সন্তান -সন্তুতি ৷ আমি এর অনুবাদ করেছি নওজোয়ান ৷ কিন্তু এ বিশেষ শব্দটির মাধ্যমে কুরআন মজীদে যে কথা বর্ণনা করতে চায় তা হচ্ছে এই যে, বিভীষিকাময় দিনগুলোতে গুটিকয় ছেলেমেয়ই তো সত্যের সাথে সহযোগিতা করার এবং সত্যের পতাকাবাহিকে নিজেদের নেতা হিসেবে মেনে নেয়ার দুঃসাহস করেছিল৷ কিন্তু মা -বাপ ও জাতির বয়ষ্ক লোকেরা এ সৌভাগ্য লাভ করতে পারেনি৷ তারা তখন বৈষয়িক স্বার্থ পূজা , সুবিধাবাদিতা ও নিরাপদ জীবন যাপনের চিন্তায় এত বেশী বিভোর ছিল যে, এমন কোন সত্যের সাথে সহযোগিতা করতে তারা উদ্যোগী হয়নি যার পথ তারা দেখছিল বিপদসংকূল৷ বরং তারা উল্টো নওজোয়ানদের পথ রোধ করে দাঁড়াচ্ছিল৷ তাদেরকে বলছিল, তোমরা মূসার ধারে কাছেও যেয়ো না, অন্যথায় তোমরা নিজেরা ফেরাউনের রোষাগ্নিতে পড়বে এবং আমাদের জন্যও বিপদ ডেকে আনবে৷ কুরআনের একথা বিশেষভাবে সুষ্পষ্ট করে পেশ করার কারণ হচ্ছে এই যে, মক্কার জনবসতিতেও মুহাম্মাদ (সা) এর সাথে সহযোগিতা করার জন্য যারা এগিয়ে এসেছিলেন তারাও জাতির বয়স্ক ও বয়োবৃদ্ধ লোক ছিলেন না৷ বরং তারাও সবাই ছিলেন বয়সে নবীন৷ আলী ইবনে আবী তালেব (রা) ,জাফর ইবনে তাইয়ার(রা), যুবাইর (রা),তালহা (রা), সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা), মুসআব ইবনে উমাইর (রা), আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের (রা) মতো লোকদের বয়স ইসলাম গ্রহণের সময় ২০ বছরের কম ছিল৷ আবদুর রহমান ইবনে আউফ(রা), বিলাল(রা) ও সোহাইবের (রা) বয়স ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ছিল৷ আবু উবাদাহ ইবনুল জাররাহ (রা),যায়েদ ইবনে হারেসাহ (রা), উসমান ইবনে আফ্ফান(রা), ও উমর ফারুকের (রা) বয়স ছিল ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে৷ এদের সবার থেকে বেশী বয়সের ছিলেন হযরত আবুবকর সিদ্দীক(রা)৷ তার বয়স ঈমান আনার সময় ৩৮ বছরের বেশী ছিল না৷ প্রথমিক মুসলমানদের মধ্যে শুধুমাত্র একজন সাহাবীর নাম আমরা পাই যার বসয় ছিল নবী (সা) এর চেয়ে বেশী ৷ তিনি ছিলেন হযরত উবাদাহ ইবনে হারেস মুত্তালাবী (রা)৷ আর সম্ভবত সাহাবীগণের সমগ্র দলের মধ্যে একমাত্র হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা) ছিলেন নবী (সা) এর সমবয়সী ৷
৭৯. মূল ইবারতে------------ ফামা আমানা লিমুছা শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে৷ এতে কেউ কেউ সন্দেহ পোষণ করেছেন, হয়তো বনী ইসরাঈলের সবাই কাফের ছিল এবং শুরুতে তাদের মধ্যে থেকে মাত্র গুটিকয় লোক ঈমান এনেছিল৷ কিন্তু ঈমান শব্দের পরে যখন লাম ব্যবহৃত হয় তখন সাধারণত এর অর্থ হয় আনুগত্য ও তাবেদারী করা৷ অর্থাৎ কারোর কথা মেনে নেয়া এবং তার কথায় ওঠাবসা করা৷ কাজেই মূলত এ শব্দগুলোর ভাবগত অর্থ হচ্ছে, গুটিকয় নওজোয়ানকে বাদ দিয়ে বাকি সমস্ত বনী ইসরাঈল জাতির কেউই হযরত মুসাকে নিজের নেতা ও পথপ্রদর্শক হিসেবে মেনে নিয়ে তার আনুগত্য করতে এবং ইসলামী দাওয়াতের কাজে তাকে সাহায্য করতে প্রস্তুত হয়নি৷ তারপর পরবর্তী বাক্যাংশ একথা সুষ্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের এ কার্যধারার আসল কারণ এ ছিল না যে, হযরত মূসার সত্যবাদী ও তার দাওয়াত সত্য হবার ব্যাপারে তাদের মধ্যে কোন সন্দেহ ছিল বরং এর কারণ শুধুমাত্র এই ছিল যে, তারা এবং বিশেষ করে তাদের প্রধান ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ হযরত মূসার সহযোগী হয়ে ফেরাউনের নির্যাতনের যাতাকলে নিষ্পেষিত হবার ঝুঁকি নিতে রাজী ছিল না৷ যদিও তারা বংশধারা ও ধর্মীয় উভয় দিক দিয়ে হযরত ইবরাহী, ইসহাক, ইয়াকুব, ও ইউসুফ (আ) এর উম্মত ছিল এবং এ দিক দিয়ে তারা সবাই মুসলমান ছিল৷ কিন্তু দীর্ঘকালীন নৈতিক অবক্ষয় এবং পরাধীনতার ফলে সৃষ্ট কাপুরুষতা তাদের মধ্যে কুফরী ও গোমরাহীর শাসনের বিরুদ্ধে ঈমান ও হেদায়াতের ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে নিজেরা এগিয়ে আসার অথবা যে এগিয়ে এসেছে তাকে সাহায্য করার মত মনোবল অবশিষ্ট রাখেনি৷

হযরত মূসা ও ফেরাউনের এ সংঘাতে সাধারণ বনী ইসরাঈলের ভূমিকা কি ছিল? একথা বাইবেলের নিম্নোক্ত অংশ থেকে আমরা জানতে পারি৷

পরে ফেরাউনের নিকট ইহতে বাহির হইয়া আসিবার সময় তাহারা মূসার ও হারুণের সাক্ষাত পাইল৷ তাহারা পথে দাঁড়াইয়া ছিলেন৷ তাহারা তাহাদিগকে কহিল, সদাপ্রভূ তোমাদের প্রতি দৃষ্টি করিয়া বিচার করুনঃ কেননা, তোমরা ফেরাউনের দৃষ্টিতে ও তাহার দাসগণের দৃষ্টিতে আমাদিগকে দুর্গন্ধ স্বরূপ করিয়া আমাদের প্রাণনাশার্থে তাহাদের হস্তে খড়গ দিয়াছ৷ (যাত্রা পুস্তক৫: ২০-২১ )

তালমুদে লেখা হয়েছে বনী ইসরাঈল মূসা ও হারুন (আ) কে বলতোঃ

"আমাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে, একটি নেকড়ে বাঘ একটি ছাগলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং রাখাল এসে নেকড়ের মুখ থেকে ছাগলটিকে বাঁচাবার চেষ্টা করলো৷ তাদের উভয়ের দ্বন্দ্ব -সংঘাতে ছাগলটা টুকরো টুকরো হয়ে গেলো৷ঠিক এভাবেই তেমার ও ফেরাউনের টানা হেঁচড়ায় আমাদের দফা রফা হয়েই যাবে ৷"

সূরা আরাফে একথাগুলোর দিকে ইংগিত করে বলা হয়েছেঃ বনী ইসরাইল হযরত মুসাকে বললোঃ

----------------------------

"তুমি আসার আগেও আমরা নির্যাতিত হয়েছি, তুমি আসার পরেও নিপীড়নের শিকার হচ্ছি৷"
৮০. মূল ইবারতে -------(মুসরিফীন )শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ এর মানে হচ্ছে, সীমা অতিক্রমকারী৷ কিন্তু এ শাব্দিক অনুবাদের সাহায্যে তার আসল প্রাণবস্তু সুষ্পষ্ট হয়ে ওঠে না৷ মুসরিফীন শব্দটির আসল অর্থ হচ্ছে, এমন সব লোক যারা নিজেদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য যে কোন নিকৃষ্টতম পন্থা অবলম্বন করতে দ্বিধা করে না৷ যারা কোন প্রকার জুলুম, নৈতিকতা বিগর্হিত কাজ এবং যে কোন ধরনের পাশবিকতা ও বর্বরতায় লিপ্ত হতে একটুও কুণ্ঠিত হয় না৷ যারা নিজেদের লালসা ও প্রবৃত্তির শেষ পর্যায়ে পৌছে যেতে পারে৷ তারা এমন কোন সীমানাই মানে না যেখানে তাদের থেমে যেতে হবে৷
৮১. এ ধরনের কথা কখনো কোন কাফের জাতিকে সম্বোধন করে বলা যেতে পারে না৷ হযরত মূসার এ বক্তব্য পরিষ্কার ঘোষণা করছে যে, সমগ্র বনী ইসরাঈল জাতিই তখন মুসলমান ছিল এবং হযরত মূসা তাদেরকে এ উপদেশ দিচ্ছিলেন যে, তোমরা যদি সত্যিই মুসলমান হয়ে থাকো যেমন তোমরা দাবী করে থাকো তাহলে ফেরাউনের শক্তি দেখে ভয় করো না বরং আল্লাহর শক্তির ওপর আস্থা রাখো৷
৮২. যেসব নওজোয়ান মূসা (আ) এর সাথে সহযোগিতা করতে এগিয়ে এসেছিলেন এটা ছিল তাদের জবাব৷ এখানে (তারা বললো) শব্দের মধ্যে তারা সর্বনামটি জাতির বা কওমের সাথে যুক্ত না হয়ে সন্তান সন্তুতি তথা নওজোয়ানদের সাথে যুক্ত হয়েছে যেমন পরবর্তী বক্তব্য থেকে বুঝা যাচ্ছে৷
৮৩. আমাদেরকে জালেম লোকদের নির্যাতনের শিকারে পরিণত করো না-উক্তি সাচ্চা ঈমানদার নওজোয়ানদের দোয়া বড়ই ব্যাপক অর্থ ও তাৎপর্যবোধক৷ গোমরাহীর সর্বব্যাপী প্রাধান্য ও আধিপত্যের মধ্যে যখন কিছু লোক সত্যের প্রতিষ্টার জন্য কোমর বেঁধে লাগে তখন তারা বিভিন্ন ধরনের জালেমদের মুখোমুখি হয়৷ একদিকে থাকে বাতিলের আসল ধারক ও বাহক৷ তারা পূরর্ণশক্তিতে এ সত্যের আহবায়কদের বিধ্বস্ত ও পর্যুদস্ত করতে চায়৷ দ্বিতীয় দিকে থাকে তথাকথিত সত্যপন্থীদের একটি বেশ বড়সড় দল৷ তারা সত্যকে মেনে চলার দাবী করে কিন্তু মিথ্যার পরাক্রন্ত শাসন ও দোর্দণ্ড প্রতাপের মোকাবিলায় সত্যপ্রতিষ্ঠিতর প্রচেষ্টা ও সংগ্রামকে অনাবশ্যক বা নির্বুদ্ধিতা মনে করে৷ সত্যের সাথে তারা যে বিশ্বাসঘাতকা করেছে তাকে কোন না কোন প্রকারে সঠিক ও বৈধ প্রমাণ করার জন্য তারা চরম প্রচেষ্টা চালায়৷ এ সংগে উল্টা তাদেরকে মিথ্যার ধারক গণ্য করে নিজেদের বিবেকের মর্মমূলে জমে উঠা ক্লেশ ও জ্বালা মেটায়৷ সত্যপন্থীদের সত্য দ্বীন প্রতিষ্ঠার দাওয়াতের ফলে তাদের মনের গভীরে সুষ্পষ্ট বা অস্পষ্টভাবে এ ক্লেশ জমে উঠে৷ তৃতীয় দিকে থাকে সাধারণ জন মানুষ৷ তারা নিরপেক্ষভাবে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখতে থাকতে৷ যার পাল্লা ভারী হয় সে সত্য হোক বা মিথ্যা তাদের ভোট শেষ পর্যন্ত তারই পাল্লায় পড়ে৷ এমতাবস্থায় এ সত্যের আহবায়কের প্রতিটি ব্যর্থতা বিপদ-আপদ ভুল ভ্রান্তি দুর্বলতা ও দোষ ক্রটি বাতিল পন্থী বা নিরপেক্ষ বিভিন্ন দলের জন্য বিভিন্নভাবে উৎপীড়ন, ও উত্যক্ত করণের সুযোগ ও উপলক্ষ হয়ে দেখা দেয়৷ তাদেরকে বিধ্বস্ত ও পর্যদস্ত করে দেয়া হলে অথবা তারা যদি পরাজিত হয়ে যায় তাহলে প্রথম দলটি বলে , আমরাই সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলাম৷ যে নির্বোধরা পরাজিত হয়ে গেছে তারা সত্যপন্থী ছিল না৷ দ্বিতীয় দলটি বলে, দেখলে তো! আমরা না বলেছিলাম , এসব বড় বড় শক্তির সাথে বিবাদ ও সংঘর্ষের ফল নিছক কয়েকটি মূল্যবান প্রাণের বিণাশ ছাড়া আর কিছুই হবে না৷ শরীয়াত কবেই বা নিজেদেরকে এ ধ্বংসের গর্তে নিক্ষেপ করার দায়-দায়িত্ব আমাদের ওপর চাপিয়েছিল? সমকালীন ফেরাউনরা তথা স্বৈরাচারী শাসকেরা যেসব ধ্যাণ ধারণা পোষণ ও কাজ করার অনুমতি দিয়েছিল তারা মাধ্যমেই তো দীনের সর্বনিম্ন প্রয়োজন দাবীগুলো পূরণ হচ্ছিল৷ তৃতীয় দলটি তার সিদ্ধান্ত শুণিয়ে দেয়, যে বিজয়ী হয়েছে সেই সত্য৷ এভাবে যদি সে তার দাওয়াতের কাজে কোন প্রকার ভুল করে বসে অথবা বিপদ ও সংকটকালে কোন সাহায্য সহায়তা না পাওয়ার কারণে দুর্বলতা দেখায় কিংবা তার বা তার কোন সদস্যের কোন নৈতিক ক্রটির প্রকাশ ঘটে তাহলে বহু লোকের জন্য মিথ্যার পক্ষাবলম্বনের হাজারো বাহানা সৃষ্টি হয়ে যায়৷ আর তারপর এ দাওয়াতের ব্যর্থতার পর সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত সত্যের দাওয়াতের উত্থানের আর কোন সম্ভবানাই থাকে না৷ কাজেই মুসা (আ) এর সাথীরা যে দোয়া করেছিলেন তা ছিল বড়ই তাৎপর্যপূর্ণ দোয়া৷ তারা দোয়া করেছিলেন, হে আল্লাহ! আমাদের প্রতি এমন অনুগ্রহ বর্ষণ করো যাতে আমরা জালেমদের জন্য ফিৎনায় তথা উৎপীড়নের অসহায় শিকারে পরিণত না হই৷ অর্থাৎ আমাদের ভূল -ভ্রান্তি দোষ-ত্রুটি ও দুর্বলতা থেকে রক্ষা করো এবং আমাদের প্রচেষ্টাকে দুনিয়ায় ফলদায়ক করো, যাতে আমাদের অস্তিত্ব তোমার সৃষ্টির জন্য কল্যাণপ্রদ হয়, জালেমদের দুরাচারের কারণে না হয়৷
৮৪. এ আয়াতটির অর্থের ব্যাপারে মুফাস্সিরদের মধ্যে মতভেদ ঘটেছিল৷ এর শব্দাবলী এবং যে পরিবেশে এ শব্দাবলী উচ্চারিত হয়েছিল তা বিশ্লেষণ করে আমি একথা বুঝেছি যে, সম্ভবত মিসরে সরকারের কঠোর নীতি ও নির্যাতন এবং বনী ইসরাঈলের নিজের দুর্বল ঈমানের কারণে ইসরাঈলী ও মিসরীয় মুসলমানদের মধ্যে জামায়াতের সাথে নামায পড়ার ব্যবস্থা খতম হয়ে গিয়েছিল৷ এর ফলে তাদের ঐক্যগ্রন্থী ছিন্নভিন্ন এবং তাদের দীনী প্রাণসত্তর মৃত্যু ঘটেছিল৷ এ জন্য এ অবস্থাটিকে নতুন কর কায়েম করারা জন্য হযরত মূসাকে হুকুম দেয়া হয়েছিল৷ তাকে বলা হয়েছিল জামায়াতবদ্ধভাবে নামায পড়ার জন্য মিসরে কয়েকটি গৃহ নির্মাণ করো, অথবাগৃহের ব্যবস্থা করে নাও৷ কারণ একটি বিকৃত ও বিক্ষিপ্ত মুসলিম জাতির দীনী প্রাণসত্তার পুনরুজ্জীবন এবং তার ইতস্তত ছড়ানো শক্তিকে নতুন করে একত্র করার উদ্দেশ্যে ইসলামী পদ্ধতিতে যে কোন প্রচেষ্টাই চালানো হবে তার প্রথম পদক্ষেপেই অনিবার্যভাবে জামায়াতের সাথে নামায কায়েম করার ব্যবস্থা করতে হবে৷ এ গৃহগুলোকে কিবলাহ গন্য করার যে অর্থ আমি বুঝেছি তা হচ্ছে এই যে, এ গৃহগুলোকে সমগ্র জাতির জন্য কেন্দ্রীয় গুরুত্বের অধিকারী এবং তাদের কেন্দ্রীয় সম্মিলন স্থলে পরিণত করতে হবে৷ আর এরপরই নামায কায়েম করো, কথাগুলো বলার মানে হচ্ছে এই যে, পৃথক পৃথকভাবে যার যার জায়গয় নামায পড়ে নেয়ার পরিবর্তে লোকদের এ নির্ধারিত স্থানগুলোয় জামায়াতে হয়ে নামায পড়তে হবে৷ কারণ কুরাআন পরিভাষায় যাকে ইকামাতে সালাত বলা হয় জামায়াতের সাথে নামায পড়া অনিবার্যভাবে তার অন্তরভুক্ত রয়েছে৷
৮৫. অর্থাৎ বর্তমান ঈমানদারদের ওপর যে হতাশা, ভীতি -বিহ্বলতা ও নিস্তেজ -নিস্পৃহা ভাব ছেয়ে আছে তা দূর কে দাও৷ তাদেরকে আশান্বিত করো৷ তাদেরকে উৎসাহিত উদ্যমশীল করো৷ সুখবর দাও, বাক্যাটির মধ্যে এসব অর্থ রয়েছে৷
৮৬. ওপরের আয়াতগুলো হযরত মূসার দাওয়াতের প্রথম যুগের সাথে সম্পর্ক রাখে৷ এ দোয়াটি হচ্ছে মিসরে অবস্থানকালের একেবারে শেষ সময়ের৷ মাঝখানে কয়েক বছরের দীর্ঘ ব্যবধান৷ এ সময়কার বিস্তারিত বিবরণ এখানে নেই৷ তবে কুরান মজীদের অন্যান্য স্থানে এ মাঝখানের যুগেরও বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে৷
৮৭. অর্থাৎ আড়ম্বর শান-শওকত ও সাংস্কৃতিক জীবনের এমন চিত্তাকর্ষক চাকচিক্য, যার কারণে দুনিয়ার মানুষ তাদের ও তাদের রীতি -নীতির মোহে মত্ত হয় এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তাদের পর্যায়ে পৌছার আকঙ্খা করতে থাকে৷
৮৮. অর্থাৎ উপায়-উপকরণ, যেগুলোর প্রাচুর্যের কারণে নিজেদের কলা-কৌশসমূহ কার্যকর করা তাদের জন্য সহজসাধ্য ছিল এবং যেগুলোর অভাবে সত্যপন্থীরা নিজেদের যাবতীয় কর্মসূচী কার্যকর করতে অক্ষম ছিল৷
৮৯. যেমন একটু আগেই আমি বলেছি, এ দোয়াটা হযরত মূসা(আ) করেছিলেন তার মিসরে অবস্থানের একবারে শেষ সময়ে৷ এটি তিনি এমন সময় করেছিলেন যখন একের পর এক সকল নিদর্শন দেখে নেবার এবং দীনের সাক্ষ প্রমাণ পূর্ণ হয়ে যাবার পরও ফেরাউন ও তার রাজসভাসদরা সত্যের বিরোধিতায় চরম হঠকারিতার সাথে অবিচল ছিল্ এহেন পরিস্থিতিতে পয়গম্বর যে বদদোয়া করেন তা কুফরীর ওপর অবিচল থাকার ব্যাপারে হঠকারিতার ভূমিকা অবলম্বনকারীদের সম্পর্কে আল্লাহর নিজের ফায়সালারই অনুরূপ হয়ে থাকে৷ অর্থাৎ তাদেরকে আর ঈমান আনার সুযোগ দেয়া হয় না৷
৯০. যারা প্রকৃত সত্য সম্পর্কে অবহিত নয় এবং আল্লাহর মহৎ উদ্দেশ্য ও মানব কল্যাণ নীতি বুঝে না, তারা মিথ্যার মোকাবিলায় সত্যের দুর্বলতা, সত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে প্রচেষ্টাকারীদের অনবরত ব্যর্থতা এবং বাতিল মতাদর্শের নেতৃবৃন্দের বাহ্যিক আড়ম্বর ঐশ্বর্য ও তাদের পার্থিব সাফল্য দেখে ধারণা করতে থাকে, হয়তো মহান আল্লাহ তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহত্মক আচরণকারীদেরকে এ দুনিয়ার ওপর কর্তৃত্বশীল দেখতে চান৷ তারা মনে করে হয়তো আল্লাহ স্বয়ং মিথ্যার মোকাবিলায় সত্যকে সমর্থন করতে চান না , তারপর এ মুর্খের দল শেষ পর্যন্ত নিজেদের বিভ্রান্তিকর অনুমানের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্তে পৌছে যে, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম আসলে অর্থহীন এবং এ অবস্থায় কুফরী ও ফাসেকী শাসনের আওতায় দীনের পথে চলার যে সামান্যতম অনুমতিটুকু পাওয়া যাচ্ছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকা উচিত৷ এ আয়াতে মহান আল্লাহ হযরত মূসা ও তার অনুসারীদেরকে এ ভ্রান্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করার তাগিদ করেছেন৷ এখানে আল্লাহর বক্তব্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে, সবরের সাথে নিজেদের প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে কাজ করে যাও৷ সাধরণত মুর্খ ও অজ্ঞরা, ও ধরনের অবস্থায় যে বিভ্রান্তির শিকার হয় তোমরাও যেন তেমনি বিভ্রান্ত না হও৷
৯১. বাইবেলে এ ঘটনার কোন উল্লেখ নেই৷ তবে তালমূদে বলা হয়েছে ডুবে যাওয়ার সময় ফেরাউন বলেছিলঃ আমি তোমার ওপর ঈমান আনছি৷ হে প্রভূ! তুমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই৷
৯২. সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিম সাগর তীরে সেখানে ফেরাউনের লাশ সাগরে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল আজো সে জায়গায়টি অপরিবর্তিত রয়েছে৷ বর্তমান সময়ে এ জায়গাটির নাম জাবালে ফেরাউন বা ফেরাউন পর্বত৷ এরি কাছাকাছি আছে একটি গরম পানির ঝরণা৷ স্থানীয় লোকেরা এর নাম দিয়েছে হাম্মামে ফেরাউন৷ এর অবস্থান স্থল হচ্ছে আবু যানীমর কয়েক মাইল ওপরে উত্তরে দিকে৷ স্থানীয় লোকেরা এ জায়গাটি চিহ্নিত করে বলে, ফেরাউনের লাশ, এখানে পড়ে থাকা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল৷ এ ডুবন্ত ব্যক্তি যদি মিনফাতাহ ফেরাউন হয়ে থাকে, যাকে আধুনিক গবেষনার মূসার আমলের ফেরাউন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে , তাহলে এর লাশ এখনো কায়রোর যাদু ঘরে রয়েছে৷ ১৯০৭ সালে স্যার গ্রাফটিন এলিট স্মিথ তার মমির ওপর থেকে যখন পট্রি খুলেছিলেন তখন লাশের ওপর লবনের একটি স্তর জমাটবাধা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল৷ এটি লবণাক্ত পানিতে তার ডুবে যাওয়ার একটি সুষ্পষ্ট আলামত ছিল৷
৯৩. অর্থাৎ আমি তো শিক্ষনীয় ও উপদেশমূলক নিদর্শনসমূহ দেখিয়েই যেতে থাকবো, যদিও বেশীর ভাগ লোকদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, বড় বড় শিক্ষনীয় নিদর্শন দেখেও তাদের চোখ খোলে না৷