(১০:৪১) যদি তারা তোমরা প্রতি মিথ্যা আরোপ করে তাহলে তুমি বলে দাও, আমার আমল আমার জন্য এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্য৷ আমি যা কিছু করি তার দায়িত্ব থেকে তোমরা মুক্ত এবং তোমরা যা কিছু করছো তার দায়িত্ব থেকে আমি মুক্ত৷ ৪৯
(১০:৪২) তাদের মধ্যে বহু লোক আছে যারা তোমার কথা শোনে৷ কিন্তু তুমি কি বধিরদের শুনাবে তারা কিছু না বুঝলেও? ৫০
(১০:৪৩) তাদের মধ্যে বহু লোক আছে যারা তোমাকে দেখে৷ কিন্তু তুমি কি অন্ধকাদের পথ দেখাবে , তারা কিছু না দেখতে পেলেও? ৫১
(১০:৪৪) আসলে আল্লাহ মানুষের প্রতি জুলুম করেন না, মানুষ নিজেই নিজের প্রতি জুলুম করে ৷ ৫২
(১০:৪৫) (আজ তারা দুনিয়ার জীবন নিয়ে মত্ত হয়ে আছে৷) আর যেদিন আল্লাহ তাদেরকে একত্র করবেন সেদিন৷ (এদুনিয়ার জীবন তাদের কাছে এমন ঠেকাবে) যেন মনে হবে তারা পরস্পরের মধ্যে পরিচয় লাভের উদ্দেশ্য নিছক একদণ্ডের জন্য অবস্থান করেছিল৷ ৫৩ (সে সময় নিশ্চিতভাবে জানা যাবে) প্রকৃতপক্ষে যারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকে মিথ্যা বলেছে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫৪ এবং তারা মোটেই সঠিক পথে ছিল না৷
(১০:৪৬) তাদেরকে যেসব খারাপ পরিণামের ভয় দেখাচ্ছি সেগুলোর কোন অংশ যদি তোমার জীবদ্দশায় দেখিয়ে দেই অথবা এর আগেই তোমাকে উঠিয়ে নেই, সর্বাবস্থায় তাদের আমারই দিকে ফিরে আসতে হবে এবং তারা যা কিছু করছে আল্লাহ তার সাক্ষী৷
(১০:৪৭) প্রত্যেক উম্মতের জন্য একজন রসূল রয়েছে ৷ ৫৫ যখন কোন উম্মতের কাছে তাদের রসূল এসে যায় তখন পূর্ণ ইনসাফ সহকারে তাদের বিষয়ের ফায়সালা করে দেয়া হয় এবং তাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও জুলুম করা হয় না৷ ৫৬
(১০:৪৮) তারা বলে যদি তোমরা এ হুমকি সত্য হয় তাহলে এটা কবে কার্যকারী হবে?
(১০:৪৯) বলো, “নিজের লাভ -ক্ষতিও আমার ইখয়তিয়ার নেই৷ সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল”৷ ৫৭ প্রত্যেক জাতির জন্য অবকাশের একটি নির্দিষ্ট সময় আছে , এ সময় পূর্ণ হয়ে গেলে তারা মুহূর্তকালও সামনে পেছনে করতে পারবে না৷ ৫৮
(১০:৫০) তাদেরকে বলো, তোমরা কি কখনো একথাও চিন্তা করেছো যে , যদি আল্লাহর আযাব অকম্মাত রাতে বা দিনে এসে যায় (তাহলে তোমরা কি করতে পারো?) এটা এমন কি জিনিস যে জন্য অপরাধীরা তাড়াহুড়া করতে চায়?
(১০:৫১) সেটা যখন তোমাদের ওপর এসে পড়বে তখন কি তোমরা ঈমান আনবে? এখন বাঁচতে চাও? অথ্চ তোমরাইতো তাগাদা দিচ্ছিলে যে, ওটা শিগগির এসে পড়ুক৷
(১০:৫২) তারপর জালেমদেরকে বলা , হবে এখন অনন্ত আযাবের স্বাদ আস্বাদন করো, তোমরা যা কিছু উপার্জন করতে তার শাস্তি ছাড়া তোমাদের আর কি বিনিময় দেয়া যেতে পারে?
(১০:৫৩) তারপর তারা জিজ্ঞেস করে যে, তুমি যা বলছো তা কি যথার্থই সত্য? বলো, “আমার রবের কসম, এটা যথার্থই সত্য এবং এর প্রকাশ হবার পথে বাধা দেবার মতো শক্তি তোমাদের নেই”৷
৪৯. অর্থাৎ অযথা বিরোধ ও কুটতর্ক করার কোন প্রয়োজন নেই৷ যদি আমি মিথ্যা আরোপ করে থাকি তাহলে আমার কাজের জন্য আমি দ্বায়ী হবো৷ এর কোন দায়ভার তোমাদের ওপর পড়বে না৷ আর যদি তোমরা সত্য কথাকে মিথ্যা বলে থাকো তাহলে এর মাধ্যমে আমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না৷ বরং এ দ্বারা তোমরা নিজেদেরই ক্ষতি করছো৷
৫০. শ্রবণ কয়েক রকমের হতে পারে৷ পশুরা যেমন আওয়াজ শোনে তেমনি এক ধরনের শ্রবণ আছে৷ আবার আর এক ধরনের শ্রবণ হয়, যার মধ্যে অর্থের দিকে নজর থাকে এবং এমনি ধরনের একটা প্রবণতা দেখা দেয় যে, যুক্তিসংগত কথা হলে মেনে নেয়া হবে৷ যারা কোন প্রকার বদ্ধ ধারণা বা অন্ধ বিদ্বেষ আক্রান্ত থাকে এবং যারা আগে থেকেই ফায়সালা করে বসে থাকে, যে নিজের উত্তরাধিকার সুত্রে পাওয়া আকীদা- বিশ্বাস ও পদ্ধতিসমূহের বিরোদ্ধে এবং নিজের প্রবৃত্তির আশা আকাংখা ও আগ্রহ বিরোধী কথা যত যুক্তিসংগতই হোক না কেন মেনে নেবো না, তারা সবকিছু শুনেও আসলে কিছুই শোনে না৷ তেমনিভাবে যারা দুনিয়ায় পশুদের মতো উদাসীন জীবন যাপন করে, চারদিকে বিচরণ করা ছাড়া আর কিছুতেই যাদের আগ্রহ নেই অথবা যারা প্রবৃত্তির স্বাদ -আনন্দের পেছনে এমন পাগলের মতো দৌড়ায় যে, তারা নিজেরা যা কিছু করেছে তার ন্যায় বা অন্যায় হবার কথা চিন্তা করে না তারা শুনেও শোনে না৷ এ ধরনের লোকদের কান বধির হয় না কিন্তু মন বধির হয়৷
৫১. ওপরের বাক্যাংশে যে কথা বলা হয়েছে এখানেও সেই একই কথা বলা হয়েছে৷ চোখের দৃষ্টি উন্মুক্ত থাকলে কোন লাভ নেই, চোখ দিয়ে তো পশুরাও দেখে৷ আসল জিনিস হচ্ছে মনের দৃষ্টি উন্মুক্ত থাকা৷এ জিনিসটি যদি কারোর অর্জিত না হয়ে থাকে তাহলে সে সবকিছু দেখেও কিছুই দেখে না৷ এ আয়াত দুটিতে নবী (সা) কে সম্বোধন করা হয়ছে ঠিকই কিন্তু তিনি যাদের সংশোধন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে নিন্দাবাদ উচ্চারণ করা হচ্ছে৷ আর এ নিন্দাবাদের উদ্দেশ্য নিছক নিন্দাবাদ নয় বরং বিদ্রুপবানে বিদ্ধ করে তাদের সুপ্ত মনুষ্যত্বকে জাগিয় তোলা এবং চোখ ও কানের মাধ্যেমে তাদের মনের ভেতরে প্রবেশ করার পথ খুলে দেয়াই এর উদ্দেশ্য্ এভাবে যুক্তিসঙ্গত কথা ও সমবেদনাপূর্ণ উপদেশ সেখানে পৌছবে পারবে৷ এ বর্ণনা পদ্ধতিটি কিছুটা এমনি ধরনের যেমন কোন সৎলোক অসৎলোকদের মাঝে উন্নত চারিত্রিক গুণাবলী সহকারে বাস করতে থাকে এবং অত্যন্ত আন্তরিকতা ও দরদসহকারে তারা যে পতনশীল অবস্থার মধ্যে পড়ে আছে সে সম্পর্ক তাদের মনে অনুভূতি জাগাতে থাকে৷ তাদের জীবন যাপন প্রণালীতে কি কি গলদ আছে এবং সঠিক জীবন যাপন প্রণানী কি তা অত্যন্ত গুরুত্বসহকাররে ও যুক্তি সংগত পদ্ধতিতে সে তাদেরকে বুঝাবার চেষ্টা করছে৷ কিন্তু তার পূত -পবিত্র জীবন থেকে কেউ এ শিক্ষা নিচ্ছে না এবং তার এ শুভাবকাংখামূলক উপদেশকেও কেউ গ্রাহ্য করছে না৷ এ অবস্থায় যখন সে তাদেরকে বুঝাবার কাজে ব্যস্ত রয়েছে এবং তারা তার কথাগুলোর প্রতি কর্ণপাত করছে না ঠিক এমন সময় তার কোন বন্ধু এসে তাকে তাকে বলে, আরে ভাই এ তুমি কি করছো? তুমি এমন লোকদের শুনাচ্ছো যারা কানে শুনে না এবং এমন লোকদের পথ দেখাচ্ছো যারা চোখ দেখে না৷ এদের মনের কানে তালা লেগেছে এবং এদের হৃদয়ের চোখ কানা হয়ে গেছে ৷ এ সৎলোককে তার সংস্কার প্রচেষ্টা থেকে বিরত রাখা তার বন্ধুর একথা বলার উদ্দেশ্য নয় ৷ বরং তার উদ্দেশ্য হল, হয়তো এ বিদ্রুপ ও তিরষ্কারের ফলে অচেতন লোকদের কিছুটা চেতন ফিরে আসবে৷
৫২. অর্থাৎ আল্লাহ তো তাদের কানও দিয়েছেন এবং মনও দিয়েছেন৷ হক ও বাতিলের পার্থক্য দেখার ও বুঝার জন্য প্রয়োজন ছিল এমন কোন জিনিস তিনি নিজের পক্ষ থেকে তাদের দিতে কার্পণ্য করেননি ৷ কিন্তু লোকেরা প্রবৃত্তির দাসত্ব ও দুনিয়ার প্রেমে মত্ত হয়ে নিজেরাই নিজেদের চোখ কানা করে নিয়েছে, কানে তোলা লাগিয়েছে এবং অন্তরকে বিকৃত করে ফেলেছে৷ ফলে তার মধ্যে ভাল মন্দের পার্থক্য ভুল -নির্ভূলের জ্ঞান এবং বিবেকের সজীবতার কোন লক্ষণ খুজে পাওয়া যায় না৷
৫৩. অর্থাৎ যখন একদিকে তাদের সামনে থাকবে আখেরাতের অনন্ত জীবন এবং অন্যদিকে তারা পেছনে ফিরে নিজেদের পৃথীবীর জীবনের দিকে তাকাবে তখন তাদের ভবিষ্যতের তুলনায় নিজেদের এ অতীত বড়ই সমান্য ও নগণ্য মনে হবে৷ সে সময় তারা একথা উপলদ্ধি করতে পারবে, যে তারা নিজেদের পূর্ববর্তী জীবনের সামান্য স্বাদ ও লাভের বিনিময়ে নিজেদের এ চিরন্তন ভবিষ্যত নষ্ট করে কত বড় বোকামী করেছে!
৫৪. অর্থাৎ একদিন আল্লাহর সামনে হাযির হতে হবে, একথাকে মিথ্যা বলেছে৷
৫৫. এ উম্মত শব্দটি এখানে শুধুমাত্র সম্প্রদায় অর্থে ব্যবহৃত হয়নি বরং একজন রসূলের আগমনের পর তার দাওয়াত যেসব লোকেরা কাছে পৌছে তারা সবাই তার উম্মতভুক্ত হয়ে যায়৷ তাছাড়া রসূলকে তাদের মধ্যে জীবিত অবস্থায় উপস্থিত থাকতে হবে এটা এ জন্য অপরিহার্য নয়৷ বরং রসূলের পরেও যতদিন পর্যন্ত তার শিক্ষা অবিকৃত থাকবে এবং তিনি মূলত কিসের তালিম দিতেন এ বিষয়টি জানা প্রত্যেক ব্যক্তির পক্ষে যতদিন সম্ভব হবে ততদিন পর্যন্ত দুনিয়ার সমস্ত মানুষ তারই উম্মত গণ্য হবে৷এ ক্ষেত্রে সামনে দিকে যে বিধানের আলোচনা আসছে তা তাদের ওপর কার্যকর হবে৷ এ দৃষ্টিতে মুহাম্মাদ (সা) এর আগমনের পর সারা দুনিয়ার মানুষ তার উম্মতভুক্ত৷ যতদিন কুরআন তার নির্ভুল এ নির্ভেজাল অবস্থায় প্রকাশিত হতে থাকবে ততদিন এ অবস্থা অপরিবর্তিত থাকবে৷ এ কারণে আয়াতে একথা বলা হয়নি যে, প্রত্যেক জাতির বা (সম্প্রদায়ের ) মধ্যে একজন রসূল রয়েছে বরং বলা হয়েছে প্রত্যেক উম্মতের জন্য একজন রসূল রয়েছে৷
৫৬. এর অর্থ হচ্ছে , রসূলের দাওয়াত কোন মানব গোষ্ঠীর কাছে পৌছে যাওয়ার পর ধরে নিতে হবে যে, সেই গোষ্ঠীর হেদায়াতের জন্য আল্লাহর যা কিছু করণীয় ছিল, তা করা হয়ে গেছে৷ এরপর কেবল ফায়সালা করাই বাকি থেকে যায়৷ অতিরিক্ত কোন যুক্তি বা সাক্ষ -প্রমাণের অবকাশ থাকে না৷ আর চূড়ান্ত ইনসাফ সহকারে এ ফায়সালা করা হয়ে থাকে৷ যারা রসূলের কথা মেনে নেয় এবং নিজেদের নীতি ও মনোভাব পরিবর্তন করে তারা আল্লাহর রহমত লাভের অধিকারী হয়৷ আর যারা তার কথা মেনে নেয় না তারা শাস্তি লাভের যোগ্য হয়৷ তাদেরকে এ শাস্তি দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জায়গায় দেয়া যেতে পারে বা এক জায়গায়৷
৫৭. অর্থাৎ আমি কবে একথা বলেছিলাম যে, আমিই এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত করবো এবং অমান্যকারীদেরকে আমিই শাস্তি দেবো ?কাজেই সিদ্ধান্ত বাস্তাবায়নের হুমকি কবে কার্যকরী করা হবে, একথা আমাকে জিজ্ঞেস করছো কেন? হুমকি তো আল্লাহ দিয়েছেন৷তিনিই তার ফায়সালা বাস্তাবায়িত করবেন৷ কখন ফায়সালা করবেন এবং কিভাবে তা তোমাদের সামনে আনবেন তা সব তারই ইচ্ছাধীন৷
৫৮. এ অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ তাড়াহুড়া করেন না৷ যখনই রসূলের দাওয়াত কোন ব্যক্তি বা দলের কাছে পৌছে যায়, তখনই যারা ঈমান আনে কেবল তারাই রহমতের হকদার হবে৷ এবং যারা তা মানতে অস্বীকার করবে অথবা মেনে নিতে ইতস্তত করবে তাদেরকে সংগে সংগে শাস্তি দেবার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে৷ এটা আল্লাহর রীতি নয়৷ বরং আল্লাহর রীতি হচ্ছে, নিজের বাণী পৌছিয়ে দেবার পর তিনি প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ব্যক্তিগত মর্যাদা অনুযায়ী এবং প্রত্যেক দল ও জাতিকে তার সমগ্রিক মর্যাদা অনুসারে চিন্তা-ভাবনা ও বোঝাপড়া করার জন্য যথেষ্ট সময় দেন৷ এ অবকাশকাল অনেক সময় শত শত বছর ধরে চলতে থাকে৷ এ ব্যাপারে কার কতটা অবকাশ পাওয়া উচিত তা আল্লাহই ভাল জানেন৷ তারপর পুরোপুরি ইনসাফের ভিত্তিতে দেয়া এ অবকাশ যখন পূর্ণ হয়ে যায় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা দল তার বিদ্রোহাত্মক নীতি পরিবর্তন করতে চায় না তখন এরি ভিত্তিতে তার ওপর আল্লাহ তার ফায়সালা কার্যকর করেন৷ এ ফায়সালার সময়টি আল্লাহর নির্ধারিত সময় থেকে এক মুহূর্ত আগেও আসতে পারে না এবং সময় এসে যাবার পর মুহূর্তকালের জন্য তাকে ঠেকিয়ে রাখাও সম্ভব নয়৷