(১০:৩১) তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, “কে তোমাদের আকাশ ও পৃথিবী থেকে রিযিক দেয়? এই শুনার ও দেখার শক্তি কার কর্তৃত্বে আছে ? কে প্রাণহীন থেকে সজীবকে এবং সজীব থেকে প্রাণহীনকে বের করে? কে চালাচ্ছে এই বিশ্ব ব্যবস্থাপনা”?তারা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ৷ বলো, তবুও কি তোমরা (সত্যের বিরোধী পথে চলার ব্যাপারে৷)সতর্ক হচ্ছো না?
(১০:৩২) তাহলে তো এ আল্লাহই তোমাদের আসল রব৷৩৮ কাজেই সত্যের পরে গোমরাহী ও বিভ্রান্তি ছাড়া আর কি বাকি আছে? সুতরাং তোমরা কোনদিকে চালিত হচ্ছো? ৩৯
(১০:৩৩) (হে নবী! দেখো) এভাবে নাফরমানীর পথ অবলম্বনকারীদের ওপর তোমরা রবের কথা সত্য প্রতিপন্ন হয়েছে যে, তারা ঈমান আনবে না৷৪০
(১০:৩৪) তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, তোমাদের তৈরী করা, শরীকদের মধ্যে কেউ আছে কি যে সৃষ্টির সুচন করে আবর তার পুনরাবৃত্তিও করে? -বলো, একমাত্র আল্লাহই সৃষ্টির সূচনা করে এবং তার পুনরাবৃত্তির ঘটনা, ৪১ কাজেই তোমরা কোন উল্টো পথে চলে যাচ্ছো ? ৪২
(১০:৩৫) তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, তোমাদের তৈরী করা শরীকদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি যে সত্যের দিকে পথনির্দেশ করে? ৪৩ বলো, একমাত্র আল্লাহই সত্যের দিকে পথনির্দেশ করেন তাহলে বলো, যিনি সত্যের দিকে পথনির্দেশ করেন তাহলে বলো, যিনি সত্যের দিকে পথনির্দেশ করেন তিনি আনুগত্য লাভের বেশী হকদার না যাকে পথ না দেখলে পথ পায় না- সে বেশী হকদার? তোমাদের হয়েছে কি? কেমন উল্টো সিদ্ধান্ত করে বসছো?
(১০:৩৬) আসলে তাদের বেশীরভাগ লোকই নিছক আন্দাজ -অনুমানের পেছনে চলছে৷ ৪৪ অথচ আন্দাজ -অনুমান দ্বারা সত্যের প্রয়োজন কিছুমাত্র মেটে না৷ তারা যা কিছু করছে তা আল্লাহ ভালভাবেই জানেন৷
(১০:৩৭) আর এ কুরআন আল্লাহর অহী ও শিক্ষা ছাড়া রচনা করা যায় না৷ বরং এ হচ্ছে যা কিছু আগে এসেছিল তার সত্যায়ন এবং আল কিতাবের বিশাদ বিবরণ ৷ ৪৫ এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটি বিশ্ব জাহানের অধিকর্তার পক্ষ থেকে এসেছে৷
(১০:৩৮) তারা কি একথা বলে, পয়ম্বর নিজেই এটা রচনা করেছে?বলো , “তোমাদের এ দোষারুপের ব্যাপারে তোমরা যতি সত্যবাদী হয়ে থাকো তাহলে এরই মতো একটি সূরা রচনা করে আনো এবং এক আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাকে ডাকতে পারো সাহায্যের জন্য ডেকে নাও” ৪৬
(১০:৩৯) আসল ব্যাপার হচ্ছে, যে জিনিসটি এদের জ্ঞানের আওতায় আসেনি এবং যার পরিমাণও এদের সামনে নেই তাকে এরা (অনর্থক আন্দাজে ) মিথ্যা বলে৷ ৪৭ এমনিভাবে এদের আগের লোকেরাও মিথ্যা আরোপ করেছে৷ কাজেই দেখো জালেমদের পরিনাম কী হয়েছে!
(১০:৪০) তাদের মধ্য থেকে কিছু লোক ঈমান আনবে এবং কিছু লোক ঈমান আনবে না৷ আর তোমার রব এ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে ভালভাবেই জানেন৷ ৪৮
৩৮. অর্থাৎ যদি এসবই আল্লাহর কাজ হয়ে থাকে, যেমন তোমরা নিজেরও স্বীকার করে থাকো, তাহলে তো প্রমাণিত হলো যে, একমাত্র আল্লাহই তোমাদের প্রকৃত মালিক, প্রতিপালক প্রভু, এবং তোমাদের বন্দেগী ও ইবাদতের হকদার৷ কাজেই অন্যেরা যাদের এসব কাজে কোন অংশ নেই তারা কেমন করে রবের দায়িত্বে শরীক হয়ে গেলো৷
৩৯. মনে রাখতে হবে, এখানে সাধারণ লোকদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে৷ তাদেরকে একথা বলা হচ্ছে না যে, তোমরা কোন দিকে চলে যাচ্ছো? বরং বলা হচ্ছে, তোমরা কোন দিকে চালিত হচ্ছো? এ থেকে সুস্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে , এমন কিছু বিভ্রান্তিকারী ব্যক্তি বা দল আছে যারা লোকদেরকে সঠিক দিক থেকে টেনে নিয়ে ভুল দিকে ফিরিয়ে দেয়৷ তাই মানুষকে আবেদন জানানো হচ্ছে, তোমরা অন্ধ হয়ে ভূল পথপ্রদশর্নকারীদের পেছনে ছুটে যাচ্ছো কেন? নিজেদের বুদ্ধি ব্যবহার করে চিন্তা করছো না কেন যে, প্রকৃত সত্য যখন এই , তখন তোমাদেরকে কোন দিকে চালিত করা হচ্ছে? এরূপ ক্ষেত্রে কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় লোকদেরকে এ ধরনের প্রশ্ন করার রীতি অনুসৃত হয়েছে৷ এসব জায়গায় বিভ্রান্তকারীদের নাম না নিয়ে তাদেরকে উহ্য বা পর্দান্তরালে রাখা হয়েছে৷ যাতে তাদের ভক্ত অনুরক্তরা ঠাণ্ডা মাথায় নিজেদের ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করতে পারে এবং কোন ব্যক্তি একথা বলে তাদেরকে উত্তেজিত করার এবং তাদের চিন্তাগত ও বুদ্ধিবৃক্তিক ভারসাম্য বিনষ্ট করার সুযোগ না পায় যে দেখো তোমাদের মুরব্বী ও নেতৃবৃন্দের সমালোচনা করা হচ্ছে এবং তাদেরকে আঘাত দেয়া হচ্ছে৷ এর মধ্যে প্রচার কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রচ্ছন্ন রয়েছে৷ এ ব্যাপারে সজাগ থাকা উচিত৷
৪০. অর্থাৎ এমনি ধরনের সব স্পষ্ট ,দ্ব্যর্থহীন ও সহজবোধ্য যুক্তি প্রমাণের সাহায্যে বক্তব্য বুঝানো হয় কিন্তু যারা মানবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেছে তারা একগুয়েমীর বশবর্তী হয়ে কোন প্রকারেই মেনে নিচ্ছে না৷
৪১. সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে মুশরিকরাও স্বীকার করতো যে, এটা একমাত্র আল্লাহরই কাজ ৷ তার সাথে যাদেরকে তারা শরীক করে তাদের কারো এ কাজে কোন অংশ নেই৷ আর সৃষ্টির পুনরাবৃত্তির ব্যাপারটিও সুষ্পষ্ট৷ অর্থাৎ প্রথমে যিনি সৃষ্টি করেন তার পক্ষেই দ্বিতিয়বার সৃষ্টি করা সম্ভব৷ কিন্তু যে প্রথমবারই সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়নি সে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে পারে কেমন করে? এটি যদিও একটি অকাট্য যুক্তিসংগত কথা এবং মুশরিকদের মন ও ভেতর থেকে এর সত্যতার সাক্ষ দিতো তবুও তারা শুধুমাত্র এ কারণে একথা স্বীকার করতে ইতস্তত করতো যে, এটা মেনে নিলে পরকাল অস্বীকার করা কঠিন হয়ে পড়বে৷ এ কারনেই পূর্ববর্তী প্রশ্নের জবাবে তো আল্লাহ বললেন যে, তারা নিজেরাই বলবে, যে এটা আল্লাহর কাজ৷ কিন্তু এখানে এর পরিবর্তে নবী (সা) কে বলা হচ্ছে , তুমি জোরালো কণ্ঠে বলে দাও প্রথমবার সৃষ্টি এবং সৃষ্টির পুনরাবৃত্তি সবই একমাত্র আল্লাহর কাজ৷
৪২. অর্থাৎ যখন তোমাদের জীবনের সূচনার প্রান্তভাগ আল্লাহর হাতে এবং শেষের প্রান্ত ভাগও তাঁরই হতে৷ তখন নিজেদের কল্যাণকামী হয়ে একবার ভেবে দেখো, তোমাদের কিভাবে একথা বুঝানো হয়েছে, এই দুই প্রান্তের মাঝখানে আল্লাহ ছাড়া অন্য জন তোমাদের বন্দেগী ও নযরানা লাভের অধিকার লাভ করেছে?
৪৩. এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন৷ একটু বিস্তারিতভাবে এটিকে বুঝে নিতে হবে৷ দুনিয়ায় মানুষের প্রয়োজন শুধুমাত্র তার খাদ্য, পানীয় ,পোশাক, ও জীবন যাপনের জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি লাভ করা এবং বিপদ -আপদ ও ক্ষতি থেকে সংরক্ষিত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়৷ বরং জীবন যাপন করার সঠিক পদ্ধতি জানাও তার একটি প্রয়োজন ( এবং সবচেয়ে বড় প্রয়োজন) ৷ তার আরো জানতে হবে, নিজের ব্যক্তিগত সত্তার সাথে, নিজের শক্তি, সমার্থ, যোগ্যতা, ও কর্মক্ষমতার সাথে, পৃথিবীতে যে উপায় উপকরণ ও সাজ -সরঞ্জাম তার কর্তৃত্বাধীনে আছে তার সাথে, যে অসংখ্য মানুষের সাথে বিভিন্নভাবে তাকে জড়িত হতে হয় তাদের সাথে এবং সামগ্রিকভাবে যে বিশ্ব ব্যবস্থার আওতাধীনে তাকে কাজ করতে হয় তার সাথে তার কি ব্যবহর করতে হবে এবং কিভাবে করতে হবে৷ এটা জানা এ জন্য প্রয়োজন যেন তার জীবন সামাগ্রীকভাবে সফলকাম হয় এবং তার প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম বিভিন্ন ভুল পথে নিয়োজিত হয়ে ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়৷ এ সঠিক পদ্ধতির নাম হক বা সত্য আর যে পথনিদর্শনা মানুষকে এ পদ্ধতির দিকে নিয়ে সেটিই হকের হেদায়াত বা সত্যের পথনির্দেশনা ৷ কুরআন সমস্ত মুশরিককে এবং নবীর শিক্ষা মেনে নিতে অস্বীকার করেছে এমন সকল লোককে জিজ্ঞেস করে, তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের বন্দেগী করো তাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি যার মাধ্যমে তোমরা সত্যের পথনির্দেশনা লাভ করতে পার? অবশ্যি সবাই জানে, এর জবাব না ছাড়া আর কিছুই নয়৷ কারণ মানুষ আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে বন্দেগী করে তারা দুটি বড় বড় ভাগে বিভক্ত৷

একঃ দেব-দেবী, জীবিত ও মৃত মানুষ, যাদের পূজা করা হয়৷ তারা অলৌকিক পদ্ধতিতে মানুষের প্রয়োজন পূর্ণ করবে এবং তাকে বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করবে এ উদ্দেশ্যেই মানুষ তাদের দিকে রুজু হয়৷ আর সত্যের পথনির্দেশনার ব্যাপারে বলা যায় , এ জিনিসটা কখনো ঐসব দেব -দেবী ইত্যাদির পক্ষ থেকে আসেওনি, মুশরিকরাও কখনো এজন্য তাদের কাছে ধর্ণা দেয়নি এবং কোন মুশরিক একথা বলেও না যে, তার দেবতারা তাকে নেতিকতা, সামাজিক জীবন যাপন পদ্ধতি ,সাংস্কৃতি, বিধান, অর্থনীতি, রাজনীত, আইন আদালাত, ইত্যাদির মূলনীতি শেখায়৷

দুইঃ এমন ধরনের মানুষ যাদের রচিত নীতিমালা ও আইনের আনুগত্য করা হয়৷ এ দিক দিয়ে তারা যে নেতা এবং পথপ্রদর্শক , তাতে কোনই সন্দেহ নেই৷ কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে তারা কি সত্যপন্থী নেতা বা নেতা হতে পারে? মানুষের জীবন যাপনের সঠিক মূলনীতি রচনা করার জন্য যেসব তত্ব জানা প্রয়োজন তাদের কেউ কি সেসব সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞান রাখে? মানুষের জীবনের সাথে সম্পর্কিত সমস্যাগুলো যে বিস্তীর্ণ পরিসরে ছড়িয়ে আছে তাদের কারো দৃষ্টি কি তার সবটার ওপর পৌছে যায়? তাদের কেউ কি এমন সব দুর্বলতা, স্বার্থ প্রীতি,একদেশদর্শিতা, গোষ্ঠিপ্রীতি, ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠিগত আশা আকাংখা লোভ লালসা ও ঝোক প্রবণতা থেকে মুক্ত যা মানুষের সমাজ জীবনের জন্য ন্যায়নিষ্ঠা আইন প্রণয়নের পথে বাধা হয়ে থাকে? জবাব যদি না বাচক হয় এবং এ কথা সুষ্পষ্ট যে, কোন সুস্থ বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি এ প্রশ্নগুলোর হাঁ বাচক জবাব দিতে পারবেন না তাহলে এরা কি সত্য পথনির্দেশনার উৎস হতে পারে?

এ কারণে কুরআন এ প্রশ্ন করে, হে লোকেরা! তোমাদের এ ধর্মীয় ও তামাদ্দুনিক প্রভূদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি যে তোমাদের সত্য সঠিক পথের দিকে পরিচালিত করতে পারে? ওপররের প্রশ্নগুলোর সাথে মিলে এ শেষ প্রশ্নটি দীন ও ধর্মের সমগ্র বিষয়ের ফায়সালা করে দেয়৷ মানুষের সমস্ত প্রয়োজন দুই ধরনের, এক ধরনের প্রয়োজন হচ্ছে, তার একজন প্রতিপালক হবে, একজন আশ্রয়দাতা হবে, একজন প্রার্থনা শ্রবণকারী ও অভাব পূরণকারী হবে৷ এ কার্যকারণের জগতের অস্থায়ী ও অস্থিতিশীল সহায়গুলোর মধ্যে অবস্থান করে সে তার স্থায়ী সহায় অবলম্বন করতে পারবে৷ বস্তুত ওপরের প্রশ্নগুলো এ ফায়সালা করে দিয়েছে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ এ প্রয়োজন পূর্ণ করতে পারবে না৷আর এক ধরনের প্রয়োজন হচ্ছে এই যে, এমন একজন পথপদর্শক থাকতে হবে যিনি দুনিয়ায় বসবাস করার সঠিক নীতি নির্ধারণ করে দেবেন এবং যার দেয়া জীবন বিধানের আনুগত্য পরিপূর্ণ আস্থার সাথে করা যেতে পারে৷ এই শেষ প্রশ্নটি এ ব্যাপারটিরও মীমাংসা করে দিয়েছে যে, একমাত্র আল্লাহই সেই পথপদর্শক হতে পারেন৷ এরপরে একমাত্র জিদ ও হঠকারীতা ছাড়া মানুষের মুশরিকী ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষ ( )তামাদ্দুনিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক নীতির সাথে লেপটে থাকার আর কোন কারণ থাকে না৷
৪৪. অর্থাৎ যারা বিভিন্ন ধর্ম প্রবর্তন করেছে, দর্শন রচনা করেছে এবং জীবন বিধান তৈরী করেছে, তারাও এসব কিছু জ্ঞানের ভিত্তিতে নয় বরং আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে করেছে৷ আর যারা এসব ধর্মীয় ও দীনি নেতৃবৃন্দের আনুগত্য করেছে তারাও জেনেবুঝে নয় বরং নিছক অনুমানের ভিত্তিতে তাদের পেছনে চলেছে৷ কারণ তরা মনে করে , এত বড় বড় লোকেরা যখন একথা বলেন এবং আমাদের বাপ দাদারা এসব মেনে আসছেন আবার এ সংগে দুনিয়ার বিপূল সংখ্যক লোক এগুলো মেনে নিয়ে এ অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে তখন নিশ্চয়ই এই লোকেরা ঠিক কথাই বলে থাকবেন৷
৪৫. যা কিছু আগে এসে গিয়েছিল তার সত্যায়ণ -অর্থাৎ শুরু থেকে নবীদের মাধ্যমে মানুষকে যে মৌলিক শিক্ষা দান করা হতে থাকে এ কুরআন তা থেকে সরে গিয়ে কোন নতুন জিনিস পেশ করছে না৷ বরং তার সত্যতা প্রমাণ করছে এবং তাকে পাকাপোক্ত করছে৷ যদি এটা কোন নতুন ধর্মপ্রবর্তকের মস্তিষ্কের উদ্ভাবনী ক্ষমতার ফসল হতো, তাহলে অবশ্যি এর মধ্যে পুরাতন সত্যগুলোর সাথে কিছু নিজের অভিনব বক্তব্য মিশিয়ে দিয়ে এর একটা অভিনব ও বিশিষ্ট চরিত্র ফুটিয়ে তোলার প্রচেষ্টা দেখা যেতো৷ আল কিতাবের বিশদ বিবরণ-অর্থাৎ সমস্ত আসমানী কিতাবের সারমর্ম যে মৌলিক শিক্ষাবলীর সমষ্টি, সেগুলো এর মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে যুক্তি প্রমাণ সহকারে উপদেশ দান ও বুঝাবার ভংগীতে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে এবং বাস্তব অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত করে বর্ণনা করা হয়েছে৷
৪৬. সাধারণভাবে লোকেরা এ চ্যালেঞ্জটিকে নিছক কুরআনের ভাষাশৈলী অহংকার ও সাহিত্য সুষমার দিক দিয়ে ছিল বলে মনে করে৷ কুরআনের অলৌকিকতার ওপর যেভাবে আলোচনা করা হয়েছে তার ফলে এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়৷ কিন্তু কুরআন যে, তার অন্যন্য ও অতুলনীয় হবার দাবীর ভিত্তি নিছক নিজের শাব্দিক সৌন্দর্য সুষমার ওপর প্রতিষ্ঠিত করেনি, এ ধরনের সীমিত ব্যাপার থেকে কুরআনের মর্যাদা অনেক উর্ধে৷ নিসন্দেহে ভাষাশৈলীর দিক দিয়েও কুরআন নজিরবিহীন৷ কিন্তু মূলত যে জিনিসটির ভিত্তিতে বলা হয়েছে যে, কোন মানবিক মেধা ও প্রতিভা এহেন কিতাব রচনা করতে পারে না, সেটি হচ্ছে তার বিষয়বস্তু ও শিক্ষা৷ এর মধ্যে অলৌকিকতার যেসব দিক রয়েছে এবং যেসব কারণে বলা যায় যে, এটি নিসন্দেহে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল করা কিতাব এবং কোন মানুষের পক্ষে এ ধরনের কিতাব রচনা করা অসম্ভব তা এ কুরআনেরই বিভিন্ন জায়গায় বর্ণনা করে দেয়া হয়েছে৷ এ ধরনের বর্ণনা ইতিপূর্বে যেখানেই এসেছে সেখানে আমরা তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে এসেছি এবং পরবর্তীতেও করে যেতে থাকবো৷ তাই কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় এখানে এর আলোচনা করা হলো না৷ (ব্যাখ্যার জন্য দেখুন আত -তুর টীকা ২৬,২৭ )৷
৪৭. কুরআনকে মিথ্যা সাব্যস্ত করার দুটি ভিত্তি হতে পারতো৷ গবেষণা করে তথ্য প্রমাণাদির মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে জানা যেতো যে, এটি বানোয়াট ও নকল৷ অথবা এতে যে সত্য বর্ণনা করা হয়েছে এবং যে খবর দেয়া হয়েছে তা মিথ্যা প্রমাণিত হলে তার ভিত্তিতে এ মিথ্যা সাব্যস্তকরণকে যুক্তিসঙ্গত মনে করা যেতো৷ কিন্তু মিথ্যা সাব্যস্ত করার এ দুটি কারণের মধ্য থেকে কোন একটি কারণও এখানে বর্তমান নেই৷ কোন ব্যক্তি একথা বলতে পারে না যে, এ কিতাবটি কেউ নিজে তৈরী করে আল্লাহর নামে চালিয়ে দিয়েছে, একথা সে তথ্য-জ্ঞনের ভিত্তিতে জানে৷ কেউ অদৃশ্যের পরদা উন্মোচন করে ভিতরে উকি দিয়ে দেখেও নেয়নি যে, সত্যিই সেখানে বহুসংখ্যক খোদা রয়েছে এবং এ কিতাবটিতে অর্থনক শুধুমাত্র একজন ইলাহার কথা শুনানো হচ্ছে৷ অথবা আসলে আল্লাহ ফেরেশতা অহী ইত্যাদির কোন সত্যতাই নেই এবং এ কিতাবে অযথা এসব গালগল্প বানিয়ে নেয়া হয়েছে৷ কেউ মরে গিয়েও দেখে নেয়নি যে এ কিতাবে বর্ণিত পরকালীন জীবন এবং তার হিসাব নিকাশ ও শাস্তি -পুরষ্কারের সমস্ত কাহিনীই মিথ্যা৷ কিন্তু এ সত্ত্বেও নিছক সন্দেহ ও ধারণার ভিত্তিতে এমনভাবে একে মিথ্যা বলা হচ্ছে যে, তাতে মনে হয় যেন এটি যে নকল ও মিথ্যা তা তত্ত্বিকভাবেই চূড়ান্ত অনুসন্ধানের মাধ্যমে স্থিরিকৃত হয়ে গেছে৷
৪৮. যারা ঈমান আনে না তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে , আল্লাহ এ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে খুব ভাল করেই জানেন৷ অর্থাৎ নবীর কথা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না বলে সদিচ্ছা সহকারেই আমরা তা মেনে নিতে পারছি না৷ এরূপ অজুহাত দিয়ে তারা দুনিয়াবাসীর মুখ বন্ধ করে দিতে পারে৷ কিন্তু মনের গোপন কথা যিনি জানেন সেই আল্লাহ তাদের প্রতিটি ব্যক্তি সম্পর্কে জানেন , সে কিভাবে নিজের হৃদয় ও মস্তিস্কের দরজায় তালা এটে দিয়েছে, নিজেই নিজেকে গাফলতির সাগরে ডুবিয়ে দিয়েছে নিজের বিবেকের কণ্ঠরোধ করেছে, নিজের অন্তরে সত্যের সাক্ষকে দমিয়ে দিয়েছে এবং নিজের মস্তিস্ক থেকে সত্যকে গ্রহণ করার যোগ্যতার বিলুপ্তি ঘটিয়েছে৷ সে শুনেও শোনেনি৷ বুঝেও না বুঝার ভান করেছে৷ সত্যের মোকাবিলায় নিজের অন্ধ বিদ্বেষকে নিজের পার্থিব স্বার্থকে নিজের বাতিলের সাথে সংঘর্ষমুখর স্বার্থকে এবং নিজের নফসানী খাহেশ ও আগ্রহকে প্রাধান্য দিয়েছে৷ তাই সে নিষ্পাপ ভ্রষ্টাচারী নয় বরং প্রকৃত অর্থে বিপর্যয়কারী৷