(১০:১) আলিফ -লাম -রা৷ এগুলো এমন একটি কিতাবের আয়াত যা হিকমত ও জ্ঞানের পরিপূর্ণ ৷
(১০:২) মানুষের জন্য এটা কি একটা আশ্চর্যের ব্যাপার হয়ে গেছে যে, আমি তাদেরই মধ্যে থেকে একজনকে নির্দেশ দিয়েছি (গাফলতিতে ডুবে থাকা) লোকদেরকে সজাগ করে দাও এবং যারা মেনে নেবে তাদেরকে এ মর্মে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের রবের কাছে যথার্থ সম্মান ও মর্যাদা? (একথায় ভিত্তিতেই কি) অস্বীকারকারীরা বলেছে, এ ব্যক্তি তো একজন সুষ্পষ্ট যাদুকর?
(১০:৩) আসলে তোমাদের রব সেই আল্লাহই , যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে তারপর শাসন কর্তৃত্বের আসনে অধিষ্টিত হয়েছেন এবং বিশ্ব -জগতের ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করেছেন৷ কোন শাফায়াতকারী (সুপারিশকারী ) এমন নেই, যে তার অনুমতি ছাড়া শাফায়াত করতে পারে৷ এ আল্লাহই হচ্ছেন তোমাদের রব৷ কাজেই তোমরা তারই ইবাদত করো৷ এরপরও কি তোমাদের চৈতন্য হবে না?
(১০:৪) তাঁরই দিকে তোমাদের সবাইকে ফিরে যেতে হবে৷ এটা আল্লাহর পাকাপোক্ত ওয়াদা৷ নিসন্দেহে সৃষ্টির সূচনা তিনিই করেন তারপর তিনিই দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করবেন, যাতে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে তাদেরকে পূর্ণ ইনসাফ সহকারে প্রতিদান দেয়া যায় এবং যারা কুফরীর পথ অবলম্বন করে তারা পান করে ফুটন্ত পানি এবং ভোগ করে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি নিজেদের সত্য অস্বীকৃতির প্রতিফল হিসেবে৷ ১০
(১০:৫) তিনিই সূর্যকে করেছেন দীপ্তিশালী ও চন্দ্রকে আলোকময়, এবং তার মনযিলেও ঠিকমত নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যাতে তোমরা তার সাহায্যে বছর গণনা ও তারিখ হিসেব করতে পারো৷ আল্লাহ এসব কিছু (খেলাচ্ছলে নয় বরং )উদ্দেশ্যমূলকভাবেই সৃষ্টি করেছেন্ তিনি নিজের নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে পেশ করেছেন যারা জ্ঞানবান তাদের জন্য৷
(১০:৬) অবশ্য দিন ও রাতের পরিবর্তনে এবং আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তাতে নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য যারা (ভূল দেখা ও ভূল আচরণ করা থেকে) আত্মরক্ষা করতে চায়৷ ১১
(১০:৭) এ কথা সত্য, যারা আমার সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না এবং পার্থিব জীবনেই পরিতৃপ্ত ও নিশ্চিন্তে থাকে আর আমার নিদর্শনসমূহ থেকে গাফেল,
(১০:৮) তাদের শেষ আবাস হবে জাহান্নাম এমন সব অসৎকাজের কর্মফল হিসেবে যেগুলো তারা (নিজেদের ভুল আকীদা ও ভূল কার্যধারার কারণে) ক্রমাগতভাবে আহরণ করতো৷ ১২
(১০:৯) আবার একথাও সত্য, যারা ইমান আনে (অর্থৎ যারা এ কিতাবে পেশকৃত সত্যগুলো গ্রহণ করে) এবং সৎকাজ করতে থাকে, তাদেরকে তাদের রব তাদের ঈমানদের কারণে সোজা পথে চালাবেন৷ নিয়ামত ভরা জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত হবে৷ ১৩
(১০:১০) সেখানে তাদের ধ্বনি হবে “পবিত্র তুমি যে আল্লাহ” ! তাদের দোয়া হবে, “শান্তি ও নিরাপত্তা হোক”! এবং তাদের সবকথার শেষ হবে এভাবে, “সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব -জাহানের রব আল্লাহর জন্য”৷ ১৪
১. এ প্রারম্ভিক বাক্যে একটি সূক্ষ্ম সতর্কবাণী রয়েছে৷ অজ্ঞ লোকেরা মনে করেছিল নবী কুরআনের নামে যে বাণী শুনাচ্ছেন তা নিছক ভাষার তেলেসমাতী কবিসূলভ অবাস্তব কল্পনা এবং গণক ও জ্যোতিষীদের মতো উর্ধজগৎ সম্পর্কিত কিছু আলোচানর সমষ্টি মাত্র৷ তাদেরকে এ মর্মে সতর্ক করা হচ্ছে যে, তোমাদের ধারণা ঠিক নয়৷ এগুলো তো জ্ঞানসময় কিতাবের আয়াত৷ এর প্রতি মনোযোগী না হলে তোমরা জ্ঞান থেকে বঞ্চিত থেকে যাবে৷
২. অর্থাৎ এতে অবাক হবার কি আছে? মানুষকে সতর্ক করার জন্য মানুষ নিযুক্ত না করে কি জিন, ফেরেশতা বা পশু নিযুক্ত করা হবে? আর মানুষ যদি সত্য থেকে গাফেল হয়ে ভূল পথে জীবন যাপন করে তাহলে তাদের স্রষ্টা ও প্রভু তাদেরকে নিজেদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দেবেন অথবা তিনি তাদের হেদায়াত ও পথ দেখাবার কোন ব্যবস্থা করবেন,এর মধ্যে কোনটা বিস্ময়কর? আর যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন হেদায়াত আসে তাহলে যারা তা মেনে নেবে তাদের মর্যাদা ও গৌরবের অধিকারী হওয়া উচিত , না যারা তা প্রত্যাখ্যান করবে তাদের? কাজেই যারা অবাক হচ্ছে তাদের চিন্তা করা উচিত, কি জন্য তারা অবাক হচ্ছে৷
৩. অর্থাৎ তারা তাঁকে যাদুকর বলে দোষারোপ করলো কিন্তু এ দোষ তার ওপর আরোপিত হয় কিনা একথা চিন্তা করলো না৷ কোন ব্যক্তি উন্নত বক্তৃতা ও ভাষণ দানের মাধ্যমে মানুষের মন -মস্তিষ্ক জয় করে ফেললেই সে যাদুকরের কাজ করছে এ কথা বলা চলে না৷ দেখতে হবে এ বক্তৃতা -বিবৃতির মাধ্যমে সে কি বলছে? কি উদ্দেশ্যে তার বাগ্নীতার শক্তি ব্যবহার করছে? এ বক্তৃতা বিবৃতির মাধ্যমে ঈমানদারদের জীবনে কোন ধরনের প্রভাব পড়ছে? যে বক্তা কোন অবৈধ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তার বাগ্মীতার অসাধারণ শক্তি ব্যবহার করে সে তো একজন নির্লজ্জ ,নিয়ন্ত্রণহীন ও দায়িত্বহীন বক্তা৷ সত্য, ইনসাফ ও ন্যায়নীতিমুক্ত হয়ে সে এমন সব কথা বলে দেয়, যার প্রত্যেকটি কথা শ্রোতাদের প্রভাবিত করে তা যতই মিথ্যা অতিরঞ্জিত ও অন্যায় হোক না কেন৷ তার কথায় বিজ্ঞতার পরিবর্তে থাকে জনতাকে প্রতারণা করার ফন্দী৷ কোন সুশৃংখল ও সমন্বিত চিন্তাধারার পরিবর্তে সেখানে থাকে স্ববিরোধিতা ও অসামঞ্জস্য৷ ভারসাম্যের পরিবর্তে থাকে অসমতা৷ সে নিছক নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বড় বড় বুলি আওড়ায় অথবা বাগ্মীতার মদে মত্ত করে পরষ্পরকে লড়াবার এবং এক দলকে অন্য দলের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত হবার জন্য উষ্কানী দেয়৷ লোকদের ওপর এর যে প্রভাব পড়ে তার ফলে তাদের কোন নৈতিক উন্নতি সাধিত হয় না৷এবং তাদের জীবনে কোন শুভ পরিবর্তনও দেখা দেয় না৷ অথবা কোন সৎচিন্তা কিংবা সৎকর্মময় পরিবেশ জন্ম লাভ করে না৷ বরং লোকেরা আগের চাইতেও খারাপ চরিত্রের প্রদর্শনী করতে থাকে৷ অথচ এখানে তোমরা দেখতে পাচ্ছো, নবী যে কালাম পেশ করেছেন তার মধ্যে রয়েছে সুগভীর তত্বজ্ঞান, একটি উপযোগী ও সমন্বিত চিন্তা ব্যবস্থা, সর্বোচ্চ পর্যায়ের সমতা ও ভারসাম্য, সত্য ও ন্যায়নীতির কঠোর ব্যবস্থাপনা ৷ প্রতিটি শব্দ মাপাজোকাএবং প্রতিটি বাক্য পাল্লায়, ওজন করা৷ তার বক্তৃতায় মানুষের সংশোধন ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য চিহ্নিত করা যেতে পারে না৷ তিনি যা কিছু বলে থাকেন তার মধ্যে তার নিজের পরিবারের জাতির বা কোন প্রকার দুনিয়াবী স্বার্থের কোন গন্ধই পাওয়া যায় না৷ লোকেরা যে গাফলতির মধ্যে ডুবে আছে তিনি শুধু তাদেরকে তার খারাপ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে দেন এবং যে পথে তাদের নিজেদের কল্যাণ সে দিকে তাদেরকে আহবান জানান৷ তারপর তার বক্তৃতার যে প্রভাব পড়ে তাও যাদুকুরদের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের৷ এখানে যে ব্যক্তিই তার প্রভাব গ্রহণ করেছে তার জীবনেই সুন্দর ও সুসজ্জিত হয়ে উঠেছে৷ সে আগের তুলনায় উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হয়েছে৷ তার সকল কাজে কল্যাণ ও সৎবৃত্তি প্রবল হয়ে উঠেছে৷ এখন তোমরা নিজেরই চিন্তা করো, সত্যিই কি যাদুকর এমন কথা বলে এবং তার যাদুর ফলাফল কি এমনটিই হয়?
৪. অর্থাৎ সৃষ্টি করার পরে তিনি নিস্ক্রীয় হয়ে যাননি৷ বরং নিজের সৃষ্ট বিশ্ব -জাহানের শাসন কর্তৃত্বের আসনে নিজেই সমাসীন হয়েছেন এবং এখন সমগ্র জগতের ব্যবস্থাপনা কার্যত তিনিই পরিচালনা করেছেন৷ অবুঝ লোকেরা মনে করে, আল্লাহ বিশ্ব -জাহান সৃষ্টি করে তারপর একে এমনি ছেড়ে দিয়েছেন৷ যে যেভাবে চায় চলতে পারে৷ অথবা একে অন্যদের হাওয়ালা করে দিয়েছেন৷ তারা যেভাবে চায় একে চালাতে ও ব্যবহার করতে পারে৷ এ ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত কুরআন যে সত্য পেশ করে তা হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তার এ সৃষ্টিজগতের সমগ্র এলাকায় নিজেই শাসন কর্তৃত্ব তার নিয়ন্ত্রাণাধিন৷ বিশ্ব -জাহানের বিভিন্ন স্থানে প্রতি মুহূর্তে যা কিছু হচ্ছে তা সরাসরি তার হুকুমে বা অনুমতিক্রমে হচ্ছে৷ এ সৃষ্টি জগতের সাথে তার সম্পর্ক শুধু এতটুকই নয় যে, তিনি এক সময় একে সৃজন করেছিলেন৷ বরং তিনিই সর্বক্ষণ এর পরিচালক ও ব্যবস্থাপক, একে তিনিই প্রতিষ্ঠিত রেখেছেন বলেই প্রতিষ্ঠিত আছে এবং তিনি চালাচ্ছেন বলেই চলেছে৷ (দেখুন সূরা আ'রাফ, ৪০ও ৪১ টীকা )৷
৫. অর্থাৎ দুনিয়ার পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় অন্য কারোর হস্তক্ষেপ করা তো দূরের কথা, কারোর আল্লাহর কাছে সুপারিশ করে তার কোন ফায়সালা পরিবর্তন করার অথবা কারোর ভাগ্য গড়ার ইখতিয়ারও নেই৷ বড়জোর সে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে পারে৷ কিন্তু তার দোয়া কবুল হওয়া না হওয়া পুরোপুরি আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল৷আল্লাহর এ একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার রাজ্যে নিজের কথা নিশ্চিতভাবে কর্যকর করিয়ে নেবার মতো শক্তিধর কেউ নেই৷ এমন শক্তি কারোর নেই যে, তার সুপারিশকে প্রত্যাখ্যাত হওয়া থেকে বাঁচতে পারে এবং আল্লাহর আরশের পা জড়িয়ে ধরে বসে থেকে নিজের দাবী আদায় করে নিতে পারে৷
৬. ওপরের তিনটি বাক্যে প্রকৃত সত্য বর্ণনা করা হয়েছিল অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই তোমাদের রব৷ এখন বলা হচ্ছে , এ প্রকৃত সত্যের উপস্থিতিতে তোমাদের কোন ধরনের কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত৷ মূলত রুবুবীয়াত তথা বিশ্ব -জাহানের সার্বভৌম ক্ষমতা ,নিরংকুশ কর্তৃত্ব ও প্রভূত্ব যখন পুরোপুরি আল্লাহর আয়ত্বাধীন তখন এর অনিবার্য দাবী স্বরূপ মানুষকে তারই বন্দেগী করতে হবে৷ তারপর রবুবীয়াত শব্দটি যেমন তিনটি অর্থ হয় অর্থাৎ প্রতিপালন ক্ষমতা, প্রভুত্ব ও শাসন ক্ষমতা ঠিক তেমনি এর পাশাপাশি ইবাদত শব্দেরও তিনটি অর্থ হয় অর্থাৎ পূজা ,দাসত্ব , ও আনুগত্য৷

আল্লাহর একমাত্র রব হওয়ার অনিবার্য ফল হচ্ছে এই যে, মানুষ তারই প্রতি কৃতজ্ঞ হবে, তারই কাছে প্রার্থনা করবে এবং তারই সামনে ভক্তি শ্রদ্ধা -ভালবাসায় মাথা নোয়াবে৷ এটি হচ্ছে ইবাদতের প্রাথমিক অর্থ৷

আল্লাহর একমাত্র মালিক ও প্রভূ হওয়ার অনিবার্য ফল হচ্ছে এই যে, মানুষ তার বান্দা ও দাস হয়ে থাকবে , তার মোকাবিলায় স্বেচ্ছাচারী নীতি অবলম্বন করবে না এবং তার ছাড়া আর কারোর মানসিক বা কর্মগত দাসত্ব করবে না৷ এটি ইবাদতের দ্বিতীয় অর্থ৷

আল্লাহকে একমাত্র শাসনকর্তা বলে মেনে নেবার অনিবার্য ফল হচ্ছে এই যে, মানুষ তার হুকুমের আনুগত্য করবে ও তার আইন মেনে চলবে ৷ মানুষ নিজেই নিজের শাসক হবে না৷ এবং আল্লাহ ছাড়া আর কারোর শাসন কর্তৃত্ব স্বীকার করবে না৷ এটি ইবাদতের তৃতীয় অর্থ৷
৭. অর্থাৎ যখন এ সত্য তোমাদের সামনে প্রকাশ করে দেয়া হয়েছে এবং তোমাদের পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, এ সত্যের উপস্থিতিতে তোমাদের কি কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে তখন এরপরও কি তোমাদের চোখ খুলবে না এবং এবং তোমরা এমন বিভ্রান্তির মধ্যে ডুবে থাকবে যার ফলে তোমাদের জীবনের সমগ্র দৃষ্টিভংগী ও কর্মনীতি সত্যবিরোধী পথে পরিচালিত হয়েছে?
৮. এটি নবীর শিক্ষার দ্বিতীয় মূলনীতি৷ প্রথম মূলনীতি হচ্ছে একমাত্র আল্লাহই তোমাদের রব কাজেই তারই ইবাদত করো৷ আর দ্বিতীয় মূলনীতি হচ্ছে, তোমাদের এ দুনিয়া থেকে ফিরে গিয়ে নিজেদের রবের কাছে হিসেব দিতে হবে৷
৯. এ বাক্যটির মধ্যে দাবী ও প্রমাণ উভয়েরই সমাবেশ ঘটেছে৷ দাবী হচ্ছে, আল্লাহ পুনর্বার মানুষকে সৃষ্টি করবেন৷ এর প্রমাণ হিসেবে বলা হয়েছে তিনিই প্রথমবার মানুষ সৃষ্টি করেছেন৷ আর যেব্যক্তি একথা স্বীকার করে যে আল্লাহই সৃষ্টির সুচনা করেছেন৷অবশ্যি শুধুমাত্র পাদরীদের প্রচারিত ধর্ম থেকে দূরে অবস্থান করার লক্ষে স্রষ্টাবিহীন সৃষ্টির মতে নির্বোধ জনোচিত মতবাদ পোষণ করতে উদ্যেগী কিছু নাস্তিক ছাড়া আর কে এটা অস্বীকার করতে পারে! সে কখনো আল্লাহর পক্ষে এ সৃষ্টির পুনরাবৃত্তিকে অসম্ভব বা দুর্বোধ্য মনে করতে পারে না৷
১০. এ প্রয়োজনটির ভিত্তিতেই আল্লাহ মানুষকে পুনবার্র সৃষ্টি করবেন৷ একই জিনিসের পুনঃসৃজন সম্ভব এবং তাকে দুরধিগম্য মনে করার কোন কারণ নেই, একথা প্রমাণ করার জন্য ওপরে বর্ণিত যুক্তি যথেষ্ট ছিল৷ এখন এখানে বলা হচ্ছে, সৃষ্টির এ পুনরাবর্তন বৃদ্ধি ও ন্যায়নীতির দৃষ্টিতে অপরিহার্য৷ আর এ অপরিহার্য প্রয়োজন দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা ছাড়া আর কোন পথেই পূর্ণ হতে পারে না৷ আল্লাহকে নিজের একমাত্র রব হিসেবে মনে নিয়ে যারা সঠিক বন্দেগীর নীতি অবলম্বন করবে তারা নিজেদের যথার্থ কার্যধারার পূর্ণ প্রতিদান লাভ করার অধিকার রাখে৷ অন্যদিকে যারা সত্য অস্বীকার করে তার বিরোধী অবস্থানে জীবন যাপন করবে তারাও নিজেদের এ ভ্রান্ত কার্যধারার কুফল প্রত্যক্ষ করবে৷ এ প্রয়োজন যদি বর্তমান পার্থিব জীবনে পূর্ণ না হয় ( এবং যারা হঠকারী নন তারা প্রত্যেকেই জানেনে, এ প্রয়োজন পূর্ণ হচ্ছে না) তাহলে অবশ্যি এটা পূর্ণ করার জন্য পুনরুজ্জীবন অপরিহার্য হয়ে পড়ে৷ (আরো বেশী জানার জন্য সূরা আরাফ ৩০ টীকা ও সূরা হুদ ১০৫ টীকা দেখুন৷)
১১. এটি আখেরাত বিশ্বাসের পক্ষে তৃতীয় যুক্তি৷ এ বিশ্ব -জাহানের চারদিকে মহান আল্লাহর যেসব কীর্তি দেখা যাচ্ছে, যার বড় বড় নিদর্শন সূর্য, চন্দ্র , দিন ও রাত্রির আবর্তনের আকারে মানুষের সামনে রয়েছে, এগুলো থেকে অত্যন্ত সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, কোন একটি ছোট্র শিশু এ সৃষ্টি জগতের বিশাল কারখানার স্রষ্টা নয়৷ সে কোন শিশুর মত নিছক খেলা করার জন্য এসন কিছু তৈরী করেনি আবার খেলা করে মন ভরে যাওয়ার পর এসব কিছু ভেঙে চুরে ফেলে দেবে না৷ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, তার সব কাজে রয়েছে শৃঙ্খলা , বিচক্ষণতা নৈপূণ্য ও কলা কৌশল৷ প্রতিটি অণুপরমাণু সৃষ্টির পেছনে পাওয়া যায় একটি লক্ষ্যভিসারী উদ্যেগ৷ কাজেই তিনি যখন মহাজ্ঞানী এবং তার জ্ঞানের লক্ষণ ও আলামতগুলো তোমাদের সামনে প্রকাশ্যে মওজুদ রয়েছে তখন তোমরা তার থেকে কেমন করে আশা করতে পারো যে, তিনি মানুষকে বুদ্ধিবৃত্তি, নৈতিক অনুভূতি এবং স্বাধীন দায়িত্ব এ সব কিছু ব্যবহারের ক্ষমতা দান করার পর তার জীবনের কার্যক্রম হিসেব কখনো নেবেন না এবং বুদ্ধিবৃত্তি ও নৈতিক দায়িত্বের কারণে পুরষ্কার ও শাস্তি লাভের যে যোগ্যতা অনিবার্যভাবে সৃষ্টি হয়ে যায় তাকে অনর্থক এমনিই ছেড়ে দেবেন?

অনুরূপভাবে এ আয়াতগুলোর আখেরাত বিশ্বাস পেশ করার সাথে সাথে তার স্বপক্ষে যৌক্তিক ধারাবাহিকতা সহকারে তিনটি যুক্তি পেশ করা হয়েছেঃ

একঃ দ্বিতীয় জীবন অর্থাৎ পরকালীন জীবন সম্ভব৷ কারণ, প্রথম অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনের সম্ভবনা জাজ্বল্যমান ঘটনার আকারে বিরাজমান৷

দুইঃ পরকালীন জীবনের প্রয়োজন রয়েছে৷ কারণ, বর্তমান জীবনে মানুষ নিজের নৈতিক দায়িত্ব সঠিক বা বেঠিক যেভাবে পালন করে এবং তা থেকে পুরষ্কার ও শাস্তিলাভের যে অবশ্যম্ভাবী যোগ্যতা সৃষ্টি হয় তার ভিত্তিতে বুদ্ধি ও ইনসাফ আর একটি জীবনের দাবী করে৷ সেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি তার নৈতিক কার্যক্রমের উপযুক্ত ফল প্রত্যক্ষ করবে৷

তিনঃ বুদ্ধি ইনসাফের দৃষ্টিতে যখন পরকালীন জীবনের প্রয়োজন তখন এ প্রয়োজন অবশ্যি পূর্ণ করা হবে৷ কারণ, মানুষ ও বিশ্ব জাহানের স্রষ্টা হচ্ছেন মহাজ্ঞানী৷ আর মহাজ্ঞানীর কাছে আশা করা যেতে পারে না যে, জ্ঞান ও ইনসাফ যা দাবী করে তিনি তা কার্যকর করবেন না৷

গভীরভাবে চিন্তা করলে জানা যাবে, মৃত্যুর পরের জীবনকে যুক্তির সাহায্যে প্রমাণ করতে হলে এ তিনটি যুক্তি প্রমাণ উপস্থাপনই সম্ভব এবং এ ক্ষেত্রে এগুলো যথেষ্টও৷ এ যুক্তি প্রমাণগুলোর পরে যদি আর কিছু অপূর্ণতা থেকে যায় তাহলে তা হচ্ছে মানুষকে চর্ম চোখে দেখিয়ে দেয়া যে, যে জিনিসটি সম্ভব যার অস্তিত্বশীল হওয়ার প্রয়োজনও আছে এবং যাকে অস্তিত্বশীল করা আল্লাহর জ্ঞানের দাবীও তাকে মানুষের চোখের সামনে হাযির করে দিতে হবে৷ কিন্তু বর্তমান দুনিয়াবী জীবনে এ শূণ্যতা পূর্ণ করা হবে না৷ কারণ, চোখে দেখে ঈমান আনার কোন অর্থই হয় না৷ মহান আল্লাহ মানুষের পরীক্ষা নিতে চান ৷ ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের উর্ধে উঠে নিছক চিন্তা ভাবনা ও সঠিক যুক্তি প্রমাণের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহকে মেনে নেয় কিনা , এটিই এ পরীক্ষা৷

এ প্রসঙ্গে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও বর্ণনা করা হয়েছে৷ সেটি গভীর মনোযোগের দাবী রাখে৷ বলা হয়েছে, আল্লাহ তার নিশানীগুলোকে উন্মুক্ত করে পেশ করেছেন তাদের জন্য যারা জ্ঞানের অধিকারী৷ আর আল্লাহর সৃষ্ট প্রত্যেকটি জিনিসের মধ্যে নিশানী রয়েছে তাদের জন্য যারা ভুল দেখা ও ভুল পথে চলা থেকে বাচতে চায়৷ এর মানে হচ্ছে, আল্লাহ অত্যন্ত বিজ্ঞ জনোচিত পদ্ধতিতে জীবনের নিদর্শনাবলীর মধ্যে চতুরদিকে এমন সব চিহ্ন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছেন যা ঐ নিদর্শনগুলোর পেছনে আত্মগোপন করে থাকা সত্যগুলোকে পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করছে৷ কিন্তু এ নিদর্শনগুলোর সাহায্য নিগূঢ় সত্যে একমাত্র তারাই উপনীত হতে পারে যাদের মধ্যে নিম্নোক্ত গুণ দুটি আছেঃ

একঃ তারা মূর্খতা ও অজ্ঞতাপ্রসূত একগুয়েমী বিদ্বেষ ও স্বার্থ প্রীতি থেকে মুক্ত হয়ে জ্ঞান অর্জন করার এমন সব মাধ্যম ব্যবহার করে যেগুলো আল্লাহ মানুষকে দিয়েছেন৷

দুইঃ তারা ভুল থেকে আত্মরক্ষা ও সঠিক পথ অবলম্বন করার ইচ্ছা নিজেদের অন্তরে পোষণ করে৷
১২. এখানে আবার দাবীর সাথে সাথে ইশারা -ইংগিতে তার যুক্তিও বর্ণনা করে দেয়া হয়েছে ৷ দাবী হচ্ছে, পরকালীন জীবনের ধারণা অস্বীকার করার অনিবার্য ও নিশ্চিত ফল জাহান্নাম ৷ এর প্রমাণ হচ্ছে, এ ধারণা অস্বীকার করে অথবা এ ধরনের কোন প্রকার ধারণার ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে মানুষ এমন সব অসৎকাজ করে যেগুলোর শাস্তি জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না৷ এটি একটি জাজ্বল্যমান সত্য৷ মানুষ হাজার হাজার বছর থেকে যে দৃষ্টিভংগি পোষণ এবং যে কর্মনীতি অবলম্বন করে আসছে তার অভিজ্ঞতাই এর সাক্ষ বহন করেছে৷ যারা আল্লাহর সামনে নিজেদেরকে দায়িত্বশীল এবং জবাবদিহি করতে বলে মনে করে না, যারা কখনো নিজেদের সারা জীবনের সমস্ত কাজের শেষে একদিন আল্লাহর কাছে তার হিসেব পেশ করার ভয় করে না, যারা এ ধারণার বশবর্তী হয়ে কাজ করে যায় যে, দুনিয়ার সমস্ত কাজ কারবার ও তার হিসেব নিকাশ এ দুনিয়ার জীবনেই শেষ, যাদের দৃষ্টিতে দুনিয়ায় মানুষ যে পরিমাণ সমৃদ্ধি, সুখঐশ্বর্য , খ্যাতি ও শক্তিমত্তা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে শুধুমাত্র তারই ভিত্তিতে তার সাফল্য ও ব্যর্থতা বিচার্য এবং যারা নিজেদের বস্তুবাদী ধ্যাণ ধারণার কারণে আল্লাহর আয়াতের প্রতি দৃষ্টি দেবার প্রয়োজন বোধ করে না, তাদের সারা জীবন ব্যর্থতায় পর্যবসতি হয়৷ তারা দুনিয়ায় বাস করে লাগামহীন উটের মত৷ তারা অত্যন্ত নিকৃষ্ট পর্যায়ের চারিত্রিক গুণালির অধিকারী হয়৷ পৃথিবীর জুলুম, নির্যাতন, বিপর্যয়, বিশৃংখলা, ফাসেকী ও অশ্লীল জীবন চর্চায় ভরে দেয়৷ ফলে জাহান্নামের আযাব , ভোগের যোগ্যতা অর্জন করে৷

এটি আখেরাত বিশ্বাসের পক্ষে আর এক ধরনের যুক্তি৷ প্রথম তিনটি যুক্তি ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক৷ আর এটি হচ্ছে অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ভিত্তিক৷ এখানে এটিকে শুধুমাত্র ইশারা ইংগিতে বর্ণনা করা হয়েছে৷ কিন্তু কুরআনের অন্যান্য জায়গায় আমরা একে বিস্তারিত আকারে দেখতে পাই৷ এ যুক্তিটির সারমর্ম হচ্ছেঃ মানুষের ব্যক্তিগত মনোভাব ও দৃষ্টিভংগী এবং মানবিক সমাজ ও গোষ্ঠীগুলোর সামষ্টিক মনোভাব ও দৃষ্টিভংগী ততক্ষণ পর্যন্ত সঠিক হয় না৷ যতক্ষন না আমাকে আল্লাহর সামনে নিজের কাজের জবাব দিতে হবে এ চেতনা ও বিশ্বাস মানুষের নৈতিক চরিত্রের ভিত্তিমূলে গভীরভাবে শিকড় গেড়ে বসে৷ এখন চিন্তার বিষয়, এমটাই কেন? কি কারণে এ চেতনা ও বিশ্বাস বিনষ্ট হওয়া বা দুর্বল হওয়ার সাথে সাথেই মানুষের নৈতিক ও বৃত্তি ও কর্মকাণ্ড অসৎ ও অন্যায়ের পথে ধাবিত হয়? যদি আখেরাত বিশ্বাস বাস্তব ও প্রকৃত সত্যের সাথে সামঞ্জস্যশীল না হতো এবং তার অস্বীকৃতি প্রকৃত সত্যের বিরোধী না হতো, তাহলে তার স্বীকৃতি ও অস্বীকৃতির এ প্রমান ফল একটি অনিবার্য বাধ্যবাধকতা সহকারে অনবরত আমাদের অভিজ্ঞতায় ধরা পড়তো না৷ একই জিনিস বিদ্ধমান থাকলে সবসময় সঠিক ফলাফল বের হয়ে আসে এবং তার অবর্তমানে হামেশা ভুল ফলাফলের দেখা দেয়া চুড়ান্তভাবে একথাই প্রমাণ করে যে, ঐ জিনিসটি আসলে সঠিক৷

এর জবাবে অনেক সময় যুক্তি পেশ করে বলা হয় যে, যারা পরকাল মানে না এবং যাদের নৈতিক দর্শন ও কর্মনীতি একেবারেই নাস্তিক্যবাদ ও বস্তুবাদের ভিত্তিতে তৈরী তাদের মধ্যে অনেকে এমনও আছেন যারা যথেষ্ট পাক পরিচ্ছন্ন চরিত্রের অধিকারী এবং তারা জুলুম ,বিপর্যয় ফাসেকী ও অশ্লীলতার প্রকাশ ঘটান না৷ বরং নিজেদের লেনদেন ও আচার ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার সৎ এবং মানুষ ও সৃষ্টির সেবায় নিয়োজিত থাকেন৷ কিন্তু এ যুক্তির দুর্বলতা অতি সহজেই স্পষ্ট হয়ে যায়৷ সমস্ত বস্তুবাদী ধর্মহীন দর্শন ও চিন্তা ব্যবস্থা যাচাই পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, উল্লেখিত সৎকর্মকারী, নাস্তিকদেরকে তাদের যে সৎকাজের জন্য এত মোবারকবাদ দেয়া হচ্ছে তাদের ঐসব নৈতিক সৎবৃত্তি ও বাস্তব সৎকাজের পেছনে কোন পরিচালিকা শক্তির অস্তিত্ব নেই৷ কোন ধরনের যুক্তি প্রদর্শন করে একথা প্রমাণ করা যাবে না যে, ঐ সমস্ত ধর্মহীন দর্শনে সততা, সত্যবাদীতা, বিশ্বস্ততা আমানতদারী , অহংকার , পালন , ইনসফ দানশীলতা, ত্যাগ কুরবানী , সহানুভূতি, আত্মসংগম চারিত্রিক সততা, সত্যানুসন্ধিৎসা ও অধিকার প্রদানের কারণে কোন উদ্দীপক শক্তি সক্রিয় আছে৷ আল্লাহ ও পরকালকে বাদ দেবার পর নৈতিকবৃত্তির জন্য যদি কোন কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে তাহলে তা গড়ে তোলা যায় একমাত্র উপযোগবাদের (Utilitareanism)অর্থাৎ স্বার্থপরতার ভিত্তিতে৷ বাদবাকি অন্যান্য সমস্ত নৈতিক দর্শন শুধুমাত্র কাল্পনিক আনুমানিক ও কেতাবী রচনা ছাড়া আর কিছুই নয়৷ সেগুলো বাস্তবে কার্যকার হবার যোগ্য নয়৷ আর উপযোগবাদ যে নৈতিক চরিত্র সৃষ্টি করে তাকে যতই ব্যাপকতা দান করা হোক না কেন তা বেশী দূর অগ্রসর হতে পারে না৷ বড় জোর তা এতদূর যেতে পারে যে, মানুষ এমন কাজ করবে যা থেকে তার নিজের সত্তার বা যে সমাজে সে বাস করে তার লাভবান হবার আশা থাকে৷ এটি এমন একটি জিনিস যা লাভের আশা ও ক্ষতির আশংকার ভিত্তিতে মানুষকে সুযোগ মতো সত্য ও মিথ্যা, বিশ্বস্ততা ও বিশ্বাসঘাতকতা, ঈমানদারী ও বেঈমানী, আমানতদারী ও আত্মাসাৎ ইনসাফ ও জুলুম ইত্যাকার প্রত্যেকটি সৎকাজ ও তার বিপরীতমূখী মন্দ করজে লিপ্ত করতে পারে৷ এ নৈতিক বৃত্তিগুলোর সবচেয়ে ভাল নমুনা হচ্ছে বর্তমান যুগের ইংরেজ জাতি৷ প্রায়ই এদেরকে এ বিষয়ে দৃষ্টান্ত হিসেবে পেশ করে বলা হয়ে যে, বস্তুবাদী জীবন দর্শনের অধিকারী এবং পরকালের ধারণায় বিশ্বাসী না হয়েও এ জাতির ব্যক্তিবর্গ সাধারণভাবে অন্যদের তুলনায় বেশী সৎ ,সত্যবাদী, আমানতদার,অংগীকার পালনকারী, ন্যায়নিষ্ঠা ও লেনদেনের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ৷ কিন্তু স্বার্থপ্রণোদিত নৈতিকতা ও সততা যে মোটেই টেকসই হয় না, তার সবচেয়ে সুষ্পষ্ট বাস্তব প্রমাণ আমরা এ জাতির চরিত্রেই পাই৷ সত্যিই যদি ইংরেজদের সততা, সত্যবাদিতা, ন্যায়নিষ্ঠা ও অংগীকার পালন এ বিশ্বাস ও প্রত্যয়ের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ো যে, এ গুণগুলো আদতেই এবং বাস্তবিক পক্ষেই শাশ্বত নৈতিক গুণাবলীর অন্তরভুক্ত, তাহলে এ সম্পর্কে তাদের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত দৃষ্টিভংগী পরষ্পরের বিপরীত হয় কেমন করে ? একজন ইংরেজ তার ব্যক্তিগত জীবনে এ গুণগুলোতে ভূষিত হবে কিন্তু সমগ্র জাতি মিলে যাদেরকে নিজেদের প্রতিনিধি এবং নিজেদের সামষ্টিক বিষয়াবলীর পরিচালক ও তত্বাবধায়ক মনোনীত করে তারা বৃহত্তর পরিমণ্ডলে তাদের সমাজ ও তার আন্তরজাতিক বিষয়াবলী পরিচালনার ক্ষেত্রে নগ্নভাবে মিথ্যাচার, অংগীকার ভংগ, জুলুম বে-ইনসাফী ও বিশ্বাসঘাতকতার আশ্রয় নেয় এবং তার তারপরও তারা সমস্ত জাতির আস্থা লাভ করে -এটা কেমন করে সম্ভব হয়? তারা যে মোটেই কোন স্থায়ী ও শাশ্বত নৈতিক গুণাবলীতে বিশ্বাসী নয় বরং স্রেফ পার্থিব লাভ- ক্ষতির প্রেক্ষিতেই তারা একই সময় দুটি বিপরীতধর্মী নৈতিক দৃষ্টিভংগী অবলম্বন করে থাকে বা করতে পারে, সেটাই কি এর দ্বারা প্রমাণিত হয় না?

তবুও সত্যই যদি দুনিয়ায় এমন কোন ব্যক্তির অস্তিত্ব থেকে থাকে, যে আল্লাহ ও পরকাল অস্বীকার করা সত্ত্বেও স্থায়ীভাবে কোন কোন সৎকাজ করে ও অসৎকাজ থেকে দূরে থাকে তাহলে আসলে তার এ সৎপ্রবণতা ও সৎকর্মস্পৃহা তার বস্তুবাদী জীবন দর্শনের ফল নয়৷ বরং এগুলো তার এমন সব ধর্মীয় প্রভাবের ফল যা অবচেতনভাবে তার অন্তরাত্মার মধ্যে শেকড় গেড়ে রয়েছে৷ তার এ নৈতিক সম্পদ ধর্মের ভাণ্ডার থেকে চুরি করে আনা হয়েছে এবং সে একে ধর্মহীনতার মোড়কে অবৈধভাবে ব্যবহার করছে৷ করণ সে তার ধর্মহীনতা ও বস্তুবাদীতার ভাণ্ডারে এ সম্পদটির উৎস নির্দেশ করতে কখনই সক্ষম হবে না৷
১৩. এ বাক্যটিকে হালকাভাবে নেবেন না৷ এর বিষয়বস্তুর ক্রম বিন্যাস গভীর মনোনিবেশের দাবীদার৷ পরকালীন জীবনে তারা জান্নাত লাভ করবে কেন? কারণ ,তারা পার্থিব জীবনে সত্য পথে চলেছে৷ প্রত্যেক, কাজে , জীবনের প্রতিটি বিভাগে, প্রত্যেকটি ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক বিষয়ে তারা সত্য ও ন্যায়নিষ্ঠা পথ অবলম্বন করেছে এবং বাতিলের পথ পরিহার করেছে৷

তারা প্রতিটি পদক্ষেপে, জীবনের প্রতি মোড়ে মোড়ে ও প্রতিটি পথের চৌমাথায় তারা ন্যায় ও অন্যায় হতে ও বাতিল এবং সথ্য মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করতে পারলো কেমন করে? তারপর এ পার্থক্য অনুযায়ী সঠিক পথের ওপর দৃঢ়তা এবং অন্যায় পথ থেকে দূরে থাকার শক্তি তারা কোথা থেকে পেলো?-এসব তারা লাভ করেছে তাদের রবের পক্ষ থেকে ৷ তিনিই তাত্বিক পথনির্দেশনা দান এবং বাস্তব কাজের ক্ষমতা দান ও সুযোগ সৃষ্টির উৎস৷

তাদের রব তাদেরকে পথনির্দেশন ও সুযোগ দান করেন কেন? -তাদের ঈমানের কারণে এ সুযোগ দেন৷

ওপরে এই যে ফলাফলগুলো বর্ণিত হয়েছে এগুলো কোন ঈমান ও বিশ্বাসের ফল? এমন ঈমানের ফল নয় যার অর্থ হয় নিছক বিশ্বাস করা৷ বরং এমন ঈমানের ফল যা চরিত্র ও কর্মকাণ্ডের পরিচালক শক্তি ও প্রাণসত্তায় পরিণত হয় এবং যার উদ্ধুদ্ধকারী শক্তিতে শক্তিমান হয়ে কর্ম ও চরিত্রে নেকী ও সৎবৃত্তির প্রকাশ ঘটে৷ মানুষের পার্থিব ও জৈবিক জীবনেই দেখা যায় তার জীবন ধারণ,শারীরিক সুস্থতা, কর্মক্ষমতা ও জীবনের স্বাদ আহরণ করার জন্য তাকে বিশুদ্ধও পুষ্টিকর খাদ্য খেতে হয়৷ কিন্তু শুধু খাদ্য খেয়ে নিলেই এসব গুণ ও ফল লাভ করা যায় না৷ বরং এমনভাবে খেতে হয় যার ফলে তা হজম হয়ে গিয়ে রক্ত সৃষ্টি করে এবং প্রতিটি শিরা উপ-শিরায় পৌছে শরীরের প্রতিটি অংশে এমন শক্তি সঞ্চার করে যার ফলে সে তার অংশের কাজ ঠিকমত করতে পারে৷ ঠিক একইভাবে নৈতিক জীবনে মানুষের সঠিক পথনির্দেশনা লাভ করা, সত্যকে দেখা, সত্য পথে চলা এবং সবশেষে কল্যাণ ও সাফল্য লাভ করা সঠিক আকীদা- বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে ৷ কিন্তু এমন ধরনের কোন আকীদা বিশ্বাস এ ফল সৃষ্টি করতে পারে না , যা নিছক মুখে উচ্চারিত হয় অথবা মন ও মস্তিষ্কের কোন অংশে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে থাকে৷ বরং যে আকীদা বিশ্বাস হৃদয়ের মর্মমূলে প্রবেশ করে তার সাথে একাকার হয়ে যায় এবং তারপর চিন্তা পদ্ধতি রুচি-প্রকৃতি ও মেজায -প্রবণতার অংগীভূত হয়ে চরিত্র, কর্মকাণ্ড ও জীবনভংগীতে সুষ্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠে৷ তাই এ ফল সৃষ্টিতে সক্ষম৷ যে ব্যক্তি খাদ্য খেয়ে তা যথাযথভাবে হজম করতে সক্ষম হয় তার জন্য যে পুরষ্কার রাখা হয়েছে, যে ব্যক্তি আহার করেও অনাহারীর মতো থাকে আল্লাহর জৈব বিধান অনুযায়ী সে কখনো সেই পুরষ্কারের অধিকারী হয় না৷ তাহলে যে ব্যক্তি ঈমান এনেও বেঈমানের মতো জীবন যাপন করে সে আল্লাহর নৈতিক বিধানে আনয়নের পর সৎকর্মশীলের মতো জীবন যাপনকারী যে পুরষ্কার পায় সেই পুরস্কার পাওয়ার আশা করতে পারে?
১৪. এখানে চমকপ্রদ ভংগীতে বলা হয়েছে যে, দুনিয়ার পরীক্ষাগৃহ থেকে সফলকাম হয়ে বের হয়ে সুখৈশ্বর্য ও সম্ভোগপূর্ণ জান্নাতে প্রবেশ করেই তারা বুভূক্ষের মত ভোগ্য সামগ্রীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে না এবং চারিদিক থেকে-

"হূর আনো ,শরাব আনো,

গীটার বাজাও বাজাও পিয়ানো"

-এর ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হবে না- যদিও জান্নাতের কথা শুনতেই কোন কোন বিকৃত বুদ্ধির অধিকরী লোকের মানসপটে এ ধরনের ছবিই ভেসে উঠে৷ আসলে সৎ ঈমানদার ব্যক্তি দুনিয়ায় উন্নত চিন্তা ও উচ্চাংগের নৈতিক বৃক্তি অবলম্বন করা, নিজের আবেগ -অনুভূমিরকে সংযত ও সুসজ্জিত করা, নিজের ইচ্ছা-অভিলাশকে পরিশুদ্ধ করা এবং নিজের চরিত্র ও কার্যকলাপকে পবিত্র ও পরিছন্ন করার মাধ্যমে নিজের মধ্যে যে ধরনের উৎকৃষ্টতম ব্যক্তিত্ব গড়ে তূলবে ও মহত্তম গুণাবলী লালন করবে, দুনিয়ার পরিবেশ থেকে ভিন্নতর জান্নাতের অতি পবিত্র পরিবেশে সেই ব্যক্তিত্ব এবং সেই গুনাবলী আরো বেশী উজ্জ্বল , প্রখর, ও তেজোময়, হয়ে ভেসে উঠবে৷ দুনিয়ায় আল্লাহর যে প্রশংসা ও পবিত্রতার কথা তারা বর্ণনা করতো সেখানে সেটিই হবে তাদের সবচেয়ে প্রিয় কাজ৷ দুনিয়ায় বাস করার সময় পরষ্পরের শান্তি ও নিরাপত্তা কামনার যে অনুভূতিকে তারা নিজেদের সামাজিক মনোভংগীর প্রাণ বায়ূতে পরিণত করেছিল সেখানকার সমাজ পরিবেশেও তাদের সেই অনুভূতিই সক্রিয় থাকবে৷