তাফহীমুল কুরআন : একটি বিপ্লবী তাফসির - অষ্টম পর্ব
মূলঃ প্রফেসর খুরশীদ আহমদ, অনুবাদঃ সাইয়েদ রাফে সামনান

৯. নির্ঘন্ট বা বিষয় নির্দেশিকা (INDEX)- তাফহীমুল কুরআনের আরও একটি অসামান্য বৈশিষ্ট্য এর বিষয় অভিধান। ইংরেজী ভাষায় একে ইনডেক্স বলে। আমরা বাংলাতে সূচী, নির্ঘণ্ট, নির্দেশিকা, কোষগ্রন্থ, অভিধান প্রভৃতি বলে থাকে। মহাগ্রন্থ আল কুরআনের অনেক বিচিত্র, মূল্যবান এবং অতুলনীয় বিষয় অভিধান কিংবা কোষগ্রন্থ পাওয়া যায় পৃথিবীর নানা ভাষায়। কিন্তু তাফহীমুল কুরআনের স্বতন্ত্র বিষয় অভিধান এর নিজ তুলনায় স্বয়ং তুলনাহীন। এটা কুরআন ও তাফহীমুল কুরআনের তামাম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও সূচীর এক স্বচ্ছ প্রতিচ্ছবি। আল কুরআনের যেখানে যেখানে কোন নীতি নির্ধারণী বিষয় কিংবা কোথাও কোন ছোট খাট বিষয়ের আলোচনার অবতারণা ঘটেছে সেসব কিছু অত্যন্ত যত্নসহকারে এই নির্ঘণ্টে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। যেসব গবেষক মহাগ্রন্থ আল কুরআন নিয়ে গবেষণা করেন তাদের জন্য কুরআনের বিষয়াবলীর বিশালতা এবং নির্দেশিকার প্রসারতার সামনে এই বিষয় অভিধানকে একটি অন্যতম নেয়ামত মনে হবে। তাফহীমুল কুরআনকে যদি জ্ঞানের একটি বিশ্বকোষ ধরা হয় তাহলে এই নির্ঘণ্ট সেই বিশ্বকোষে গিয়ে চড়বার সিঁড়ির সাথে তুলনীয়। আমি এই বিষয় অভিধানকে তাফহীমুল কুরআনের বিশেষ কীর্তির মধ্যে শুমার করি। কারণ, তাফসীরে কুরআনের সাথে কুরআনের বিষয়াবলীর উপর এমন অনন্য সাধারণ নির্ঘণ্ট ইতোপূর্বে কখনো লিপিবদ্ধ হয়নি।
তাফহীমুল কুরআন ও বর্তমান যুগের চ্যালেঞ্জ
আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জকে বিভিন্নভাবে জানা যায় এবং ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা করা যায়। আল কুরআনের একজন অনুসারী এবং তাফহীমুল কুরআনের একজন ছাত্র হিসেবে আমি যখন বিষয়টি নিয়ে ভাবলাম তখন এ ক্ষেত্রে আমার নিকট মোটা দাগে পৃথিবীর জাতিসমূহকে তিন তিনটি প¬vটফর্মে বিভক্ত মনে হলো :
ক. বর্তমান এই আধুনিকযুগে বৈশ্বিকভাবে ওহীকে অস্বীকার কিংবা ওহীকে বাদ দিয়ে জীবনের পুরোটা যাপন পদ্ধতি ব্যক্তিগত এবং গোষ্ঠীয় দৃষ্টিকোণ হতে কিংবা ধর্মহীন জাগতিকতার ভিত্তিতে গঠন করা হয়েছে। সমগ্র সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব এবং আধুনিক পশ্চিমা জাতিসমূহের ধর্মবিশ্বাস এই ধর্মহীনতার পোশাকেই দৃশ্যমান। হিন্দুবাদ, বৌদ্ধমত এবং অন্যান্য ইসলামী জ্ঞানশূন্য ধর্মমত সমূহের অনুসারীরাও কমবেশি উপরোক্ত দলেরই অন্তর্ভুক্ত।

খ. অন্যদিকে যারা ওহীর জ্ঞান তাদের কাছে আছে বলে দাবি করেন, তারাও সেই জ্ঞানের ধারাবাহিকতাকে শেষনবী নবীয়ে আকরাম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সালাম) পর্যন্ত মেনে নেন না। বরং তাদের স্ব স্ব নবীদের প্রতি নাযিলকৃত ঐশী জ্ঞান প্রাপ্ত ধর্ম হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। ইহুদীবাদ ও খ্রিষ্টবাদের অনুসারীরা এই দলভুক্ত।

গ. রইলো মুসলমানরা, যারা নবীয়ে আকরাম (সা.)কে সত্য হিসেবে মানে। এদের একটি বিশাল অংশ দীন ও দুনিয়াকে সম্পূর্ণ পৃথক পৃথক বিষয় হিসেবে বিশ্বাস করে তার উপর আমল করেন। দীন ও দুনিয়াকে আলাদা করার ফলে মুসলমানদের মধ্যে এমন এক সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটেছে যারা মনে করেন দীন হচ্ছে কয়েকটি ব্যক্তিগত ইবাদত বন্দেগীর ব্যাপার এবং সামাজিক জীবনের কিছু অনুষ্ঠান পার্বণের সমাহার। কিছু লোকের জন্য দীনি এইসব দায়িত্ব পালন পার্থিব কর্মসূচীর সামাজিক ও ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তারা দীনকে বাদ দেয়নি ঠিকই কিন্তু দীনি শিক্ষার আসল রুহকে নিজেদের দেহমন থেকে সরিয়ে দিয়েছে বা দিচ্ছে। এই দলটি ইসলামের বিধানকে অন্যান্য মতবাদের সাথে সংযুক্ত করে এমন এক সুবিধাবাদী মতাদর্শের ধারক হতে চায়, যাদের মুসলিম পরিচয়ের কোন খাঁটি ইমানী ভিত্তি পাওয়া দুস্কর।

যাকে আমরা আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জ বলি তা মূলত এই তিনটি বরং চারটি চ্যালেঞ্জের সমষ্টি। একটু অন্য ভাবে বলা যায় এই চ্যালেঞ্জসমূহের চারটি দিক রয়েছে। তাফহীমুল কুরআন এই চ্যালেঞ্জ সমূহের জবাব তার নিজস্ব স্টাইলে দিয়েছে। প্রথমত: প্রথম কথার মোকাবিলায় তাফহীমুল কুরআন ওহীর বাস্তবতা ও অপরিহার্যতা প্রমাণ করার জন্য দলীল উপস্থাপন করে দেখিয়েছে যে মানুষ স্রষ্টার দিক নির্দেশনার মুখাপেক্ষী এবং এই নির্দেশনা মানা এবং তার পরে আমল করার উপরই তার নাজাত, কল্যাণ ও সাফল্য নির্ভর করে। দ্বিতীয়ত: দ্বিতীয় কথার মোকাবিলায় তাফহীমুল কুরআন দেখিয়েছে যে ওহীর জ্ঞানের স্বঘোষিত ইজারাদারগণ হক কথাকে অস্বীকার করবার অপরাধে অপরাধী। বাইবেল তার অবিকৃত মূল রূপে সেই দাওয়াতই পেশ করেছে যা কুরআন আজ আমাদের বলেছে। কিন্তু বাইবেলের অনুসারীরা এর মূল রূপকে এমনভাবে বিকৃত করেছে, যার ফলে খোদ বাইবেলের মধ্যে বর্তমান সংস্করণে একে একটি পরিপূর্ণ অবিকৃত আসমানী কিতাব বলে মনে হয় না। আজ যদি কোথাও ওহীর জ্ঞান অবিকল অবিকৃত রূপে কোথাও পাওয়া যায় তা হলে শুধুমাত্র এবং কেবলমাত্র আল- কুরআনেই পাওয়া যাবে।

সর্বশেষে উক্ত দুই সম্প্রদায়কে (খ্রিষ্টান ও ইহুদী) উদ্দেশ্য করে তাফহীমুল কুরআন তাদের ভ্রান্তিসমূহের কুরআন ও বুদ্ধিবৃত্তির আলোকে পেশ করেছে; অতপর কুরআনের শিক্ষাকে মোটা দাগে আলাদা করে পরিস্কারভাবে তুলে ধরেছে। সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার সীমাবদ্ধ চিন্তাধারার আকরকে শিকড়সহ উপড়ে ফেলে এই মহাগ্রন্থ আল কুরআনের বিপ¬বী বাণীর সত্যতার প্রমাণ পেশ করেছে। সাথে সাথে এই তাফসীর এটাও বলে দেয় যে কুরআন কীভাবে জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগের নব নির্মাণ করে। কুরআন আমাদের এটাও বলে যে নাজাতের জন্য কোন শর্টকাট বিকল্প পথ নেই। জীবন যাপনের সঠিক পদ্ধতি হলো পুরোটা জীবন এক আল্লাহর বন্দেগী করে করেই কাটাতে হবে। আর আল্লাহর যমীনে একমাত্র আল্লাহর আইনই চলবে। নামায এবং অন্যান্য ইবাদতের হক তখনই আদায় হবে যখন এর সাথে সাথে জীবন এবং জীবন যাপন প্রণালীকে গুনাহ এবং তাগুতের পথ হতে হকের পথে ফিরিয়ে আনবার সংগ্রাম চলবে। তাফহীমুল কুরআন মুতাজাদ্দিদগণের ভুল ধারণা সমূহ অপনোদন করে, বিশেষ করে তারা যেসব ভুল ধারণায় অন্যদের ফেলে। তাফহীম পরিষ্কারভাবে বলে দেয় আনুগত্য এবং বিদ্রো্হের রাস্তা পৃথক, স্পষ্ট ও বোধগম্য কিন্তু ‘মানিয়া না মানিবার’ এই পন্থা বুদ্ধিবৃত্তি, কুরআন এবং চরিত্রের মৌলিক উপাদানসহ সব কিছুরই বিরোধী।
এই ভাবেই তাফহীমুল কুরআন আধুনিক যুগের প্রতিটি চ্যালেঞ্জের জবাব দিয়েছে। জবাব দানের ক্ষেত্রে তাফহীম প্রমাণ উপস্থাপন করেছে। সাথে সাথে নতুন এক ইলমে কালামের সাহায্যে দীনের কুরআনী ধারণা এবং জীবন সম্পর্কে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করে উপস্থান করেছে। আর এভাবেই এই তাফসীর গ্রন্থ সেই সব কাজ করে গিয়েছে যা করতে কয়েকটি গ্রন্থাগার লাগে।

তাফহীমুল কুরআন এই যুগের এক অভূতপূর্ব সাহিত্যকর্ম; শুধু সাহিত্যকর্মই নয় বরং এক্ষেত্রে পথ প্রদর্শক, সাথে সাথে মানুষ গড়ার কারিগর ও বটে এর দ্বারা সেই সব মানুষ তৈরি হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ হবে যারা আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা করবে এবং এ সকলের যুক্তিপূর্ণ জবাব দিবে। তাফহীমুল কুরআনের জ্ঞানের দীঘি হতে তারা যে নালা বের করে নিবে তা হবে স্রোতস্বিনী নদীর মত বহমান বেগবান। তাদের এই জ্ঞানধারা এই দীঘি হতে উৎপন্ন হয়ে বুদ্ধিবৃত্তি চিন্তা-চেতনা, সাহিত্য, বিজ্ঞান ইত্যাদি নতুন নতুন চেতনার উপত্যকাকে প¬vবিত করবে কুরআনী জ্ঞান দ্বারা।