তাফহীমুল কুরআন : একটি বিপ্লবী তাফসির - সপ্তম পর্ব
মূলঃ প্রফেসর খুরশীদ আহমদ, অনুবাদঃ সাইয়েদ রাফে সামনান

৬. মাযহাবসমূহের তুলনামূলক পর্যা লোচনা : তাফহীমুল কুরআনে ইহুদীবাদ, খ্রিষ্টবাদ এবং কুরআনের তুলনামূলক পর্যা লোচনা করা হয়েছে। এই পর্যা লোচনাসমূহে বাদানুবাদের রীতিকে পরিহার করা হয়েছে। এখানে চেষ্টা করা হয়েছে খ্রিষ্টান ধর্মবেত্তা’ যাজক শ্রেণী এবং পশ্চিমা কর্তৃক উত্থিত প্রশ্নসমূহের সাধ্যমত ন্যায়সংগত এবং সমাধানমূলক উত্তর দেবার। অতঃপর অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে আল কুরআনের বর্ণনাভঙ্গী এবং বর্তমান বাইবেলের লিখিত রূপের পরিষ্কার পার্থক্য। যেন বে-মিল ওহী এবং অকাট্য অবিকল ওহীর মধ্যকার পার্থক্য পরিদৃষ্ট হয়। মানুষ যেন খাঁটি বস্ত্তটি চিনতে পারে। মওলানা মওদূদী রহ. আল কুরআনকে নিজস্ব দলিল প্রদানের ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করিয়ে অতঃপর অন্যান্য ধর্মমত আলোচ্য বিষয়কে যেভাবে পেশ করে তার তদ্রূপ সমালোচনা করে দুটোর পার্থক্যকে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। নিজের অবস্থানকে তুলে ধরবার জন্য তিনি ঐতিহাসিক দলিল প্রমাণ, আধুনিক বাইবেলের সমালোচনা ও অন্যান্য জ্ঞানবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনসমূহকে উপস্থাপন করেছেন। একইভাবে তিনি আধুনিক মতবাদসমূহ এবং সেই যুগে উত্থিত আন্দোলনসমূহের যাচাই পর্যা লোচনা এবং সমালোচনা করেছেন এবং সেই মতবাদ ও আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত লোকের আল কুরআনের যে মনগড়া অপব্যাখ্যা করার অপচেষ্টা করেছিল তিনি তার বিপরীতে সুচিন্তিত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। তার তাফসীরে পদার্থবিদ্যা, জীববিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা, জ্যোতিবিদ্যা, শারীরবিদ্যা এবং ভূগোল থেকে শুরু করে অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা, ইতিহাস ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের বেশুমার আলোচনা ও পর্যা লোচনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তিনি জ্ঞানরাজ্যের ঐ সকল শাখা হতে কমবেশি অনেক কিছু নিয়েছেন কিন্তু প্রত্যেক ক্ষেত্রে তিনি কুরআনকে ফয়সালাকারীর মসনদে আসীন রেখেছেন। এই সকল জ্ঞান বিজ্ঞান অথবা শাস্ত্রবিদ্যা কোথাও তাকে ভ্রান্তপথে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি।

এই দৃষ্টিকোণ হতে তাফহীমুল কুরআনে মানব রচিত মতবাদ ও জীবন দর্শনসমূহের তুলনামূলক পর্যা লোচনা করে সমালোচনামূলক রেনেসাঁর বীজ রোপিত হয়েছে। এই বিষয়বস্ত্ত তার তাফসীরকে একটি যুগোপযোগী আধুনিক তাফসীরে উন্নীত করেছে। তিনি যুগের এবং সাময়িক প্রেক্ষাপটের বিষয়বস্ত্ত ও জ্ঞানের যথাযথ সমালোচনা করেছেন ঠিকই, কিন্তু কোথাও কোন আধুনিক শেস্নাগান কিংবা আধুনিকতার ছোয়া ধ্যান ধারণা, বা আদর্শ তার উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। তার অধ্যায়ে তার তরীকা কবির ভাষায় যেন-
বে রাংগ বাহর সাহিল আশনারে;
লাবে সাহিল সে দামন খেচতা জা।

৭. রেনেসার বা পুনর্জাগরণের ধারণা : উপরে আমরা যা আলোচনা করে এসেছি তদ্বারা তাফহীমুল কুরআনের সপ্তম বৈশিষ্ট্য আমাদের নিকট প্রকাশিত হয়.......... অর্থাৎ সনাতন ও নতুনের মাঝে রেনেসাঁর বোধ তথা জীবন ধারণ ও যাপনের জন্য নতুন দিনের জীবনবিধান। মওলানা মওদূদী রহ. এর কলম সবসময় চরম ও পরম পন্থার পথ পরিহার করে চলেছে। যারা খোদার দীনকে মসজিদ-মিম্বার, ব্যক্তিগত জীবন ও খানকাহের চার দেয়ালে সীমিতদায় করেছিলো মওলানার কলম তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে উঠেছে, প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে। যারা ইসলামের নাম নিয়ে ধর্মের আলখেল্লা পড়ে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার কথা বলে কুরআনের আদেশ নিষেধবাণীকে ছেলেখেলার বস্ত্ততে পরিণত করেছে তিনি কঠোর ভাষায় তাদের সমালোচনা করেছেন।

সাহেবে তাফহীমুল কুরআন (তাফহীমুল কুরআনের রচয়িতা) তার নিজ যুগের সকল সমস্যা এবং দাবিসমূহ খুব ভালোভাবেই জেনেছিলেন এবং বুঝেছিলেন কিন্তু তিনি এমন ভুল ধারণায় নিপতিত হননি যে পৃথিবী আকাশ ও নভোমন্ডলের স্রষ্টা হয়তো..... কুরআন নাযিলের সময় ভুলবশত (নাউযুবিল্লাহ) এই কথাগুলো উল্লেখ করেছেন যেসবের অর্থ বর্তমান যামানায় এভাবে সংশোধন করে নিতে হবে। যেসকল সংস্কারক উপরোক্ত ধরণের কাজ করবার দুঃসাহস করেছেন মওলানা মওদূদী রহ. তাদের কড়া সমালোচনা করেছেন। সাথে সাথে মওলানা চেষ্টা করেছেন কুরআনকে ঠিক সেই রূপে পেশ করতে কুরআনের প্রকৃত রূপ যেমন। মওলানা মওদূদী রহ. এর বক্তব্যের মূলকথা ছিলো এমন ধারণা ও প্রেরণা জন্মাতে হবে যে, আল কুরআন মোতাবেক নিজেকে বদলে ফেলতে হবে। এটাই ইসলামী রেনেসা আন্দোলন সমূহের সংগ্রামী দাওয়াত ও কর্মনীতি। তাফহীমুল কুরআন নবুওতের যুগ হতে আজতক উম্মতের সত্যনিষ্ঠ জনমন্ডলীর অনুসৃত এই কর্মনীতিকেই তুলে ধরেছে এবং হেদায়েতের এই রাজপথকে উজ্জ্বল হতে উজ্জ্বলতর আলোতে উদ্ভাসিত করবার প্রয়াস পেয়েছে।

৮. নয়া ইলমে কালাম : তাফহীমুল কুরআনের আরও একটি বিশেষত্ব হলো এই কিতাব একটি নয়া ইলমে কালামের ভিত্তি গড়েছে। প্রতিটি যুগের মাসলা-মাসায়েল এবং যুক্তিতর্ক বাহাস ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির হয়ে থাকে। প্রত্যেক কালে ও যুগের জ্ঞান বিজ্ঞানের নিজস্ব স্তর হয়। সেই জ্ঞান-বিজ্ঞানসমূহও পৃথক পৃথক হয়ে থাকে। কালস্রোতে যেগুলোর চলন ও প্রভাব চলে আসে। খ্রিষ্টান ধর্ম যাজকরা যেসব প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন এমনকি স্যার সাইয়েদ স্কুলের পক্ষ হতে যেসব উক্তি করা হয় সেসব প্রশ্নকরণের জবাব দেয়ার ব্যবস্থা আমাদের যুগে অবশ্যই করা হয়েছিল। কিন্তু একথাও একটি বাস্তব সত্য পাশ্চত্য নিশানা লক্ষ্য টার্গেট জ্ঞান ও শিল্পকলার টার্গেট করা হয়নি, যার ছত্রছায়ায় তারা এই সব উক্তি করছিল কিংবা প্রশ্নবান ছুড়ে দিচ্ছিল কিংবা আপত্তি উত্থাপন করছিল।

যদি গ্রীক চিন্তাধারা ও দর্শনের হামলার মোকবিলায় তখনকার দার্শনিক চ্যালেঞ্জের জবাবে এক নতুন ইলমুল কালাম সৃজন লাভ করে থাকে তাহলে আজও পাশ্চাত্যের জ্ঞান ও শিল্পকলা এবং পশ্চিমা সংস্কৃতি ও দর্শনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি ইলমে কালামের প্রয়োজন ছিলো। আল্লামা শিবলী নোমানী ও মওলানা আবুল কালাম আযাদ এ বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। কিন্তু তারা প্রাথমিক পর্যা য়ই অতিক্রম করতে পারেননি। মহাকবি আল্লামা ইকবালও এক্ষেত্রে যথেষ্ট ফলপ্রসূ অবদান রেখেছেন এবং আধুনিক চিন্তাধারার সক্রিয় মোকাবিলার পথ চিহ্নিত করে গেছেন। অবশ্য এই নতুন ইলমে কালামের বেশি বিস্তারিত বেশি গভীর, বেশি যুক্তিপূর্ণ উপমা ও উদাহরণ মওলানা মওদূদী রহ.র রচনাবলীতে পাওয়া যায়। তার রচিত ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বন্দ্ব, পর্দা ও ইসলাম, সুদ ও আধুনিক ব্যাংকিং, ইসলামের দৃষ্টিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ, মওদূদী রচনাবলীত (মূল উর্দু নাম তাফহীমাত), তালীমাত সুন্নতের আইনগত মর্যা দা প্রভৃতি অত্যন্ত উচ্চাঙ্গের ইলমুল কালামের গ্রন্থ। তবে এই নয়া ইলমুল কালামের সবচাইতে বেশি প্রতিনিধিত্ব মূলক কিতাব হচ্ছে তাফহীমুল কুরআন। এটা এই নয়া ইলমে কালামের উত্তম উপমাই নয় বরং ভবিষ্যতে এই ইলমে কালামের উৎস গ্রন্থ হিসেবেও কাজ করবে ইনশাআল্লাহ। আজ পর্যন্ত এই নয়া তথা আধুনিক ইলমে কালামের মূলনীতিসমূহ কেউ আলাদাভাবে লিখেননি, যদিও একাজটি পরবর্তী যুগের চিন্তাবিদ দার্শনিকদের কাজ যে তারা এই জ্ঞান ভান্ডার হতে মূলনীতিসমূহ বের করে আনবেন। তথাপি এই বিষয়ে যদি কোন ধরনের প্রাথমিক প্রচেষ্টা পরিচালিত হয় তাহলে তাফহীমুল কুরআনের ইলমুল কালামের মৌলিক কথাগুলো আশাকরি নিম্নরূপ হবে :

নয়া ইলমে কালামের মৌলিক কথা :
ক. এই ইলমে কালামে দলিল প্রমাণ উপস্থাপনা আল কুরআনের মৌলিক ও সামগ্রিক শিক্ষার আলোকে লিখতে হবে। এক একটি আয়াতকে তার মূল বিষয়বস্ত্ত থেকে কেটে ছেঁটে আলাদা করে বোঝা যায় না। কুরআন মজিদের একটি আয়াতকে বুঝতে হলে অন্যান্য স্থানে অনুরূপ যেভাবে বর্ণিত হয়েছে তা হতে বুঝতে হবে। অতঃপর এক একটি মাসলা ও বাহাসকে তখনই বোঝা যাবে যখন জীবনের সামগ্রিক পরিমন্ডলের ভিতর সেই বিষয়ের যথাযথ মর্যা দা ও স্থান নিরূপিত হয়। [এইভাবে এই ইলমুল কালামে কুরআনের সামগ্রিক শিক্ষা ও নির্দেশনাকে মৌল ভিত্তি ধরে এটা প্রমাণ করা হয়েছে যে ধর্মের নামে যে ভুল ধারণা ও কুসংস্কার হাল জমানায় প্রচলিত হয়েছে এ সবের একটি মৌলিক কারণ হলো কুরআনের সামগ্রিক শিক্ষাকে এবং কুরআনের বাস্তব জীবন দর্শনকে সুন্নাতে রাসূল সা. এর আলোকে না দেখে খন্ডিত রূপে দেখা হয়েছে।]

খ. এই ইলমে কালামের রূপদানের সময় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে খেয়াল রাখা হয়েছিল যে যুগের সেই প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের প্রকৃত দুর্বলতা সমূহ যেমন অজ্ঞতা, সমসাময়িক মতবাদসমুহের প্রতি আনুগত্য, মুনাফেকী, একটি বিশেষ গোষ্ঠীর মাঝে বেপরোয়া বুদ্ধি বিকৃতির অসৎ বাণিজ্য। তাই এর প্রতিকার এমনভাবে করা হোক যে ইসলামের শিক্ষাকে ব্যাপক প্রচার প্রসার ঘটিয়ে দীনের শিক্ষাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে অজ্ঞতার অন্ধকার মুছে ফেলতে হবে। পাশ্চাত্য চিন্তাধারা ভিত্তিসমূহ পাশ্চাত্যের অন্যতম জীবন দর্শনসমূহ ও তাদের উত্থিত আন্দোলন সমূহের উপর সর্বাত্মক হামলা চালানো হোক এবং সমালোচনা করে পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দেয়া হোক ওসবের কি ভালো ও কল্যাণকর এবং কোনটি ভ্রান্ত এবং বিভ্রান্তির উদ্যোক্তা। এই আক্রমণ চলবে পাশ্চাত্যের ধর্মহীন সমাজ ব্যবস্থার উপর তাদের চারিত্রিক হীন উদ্দেশ্য, ঔনিবেশবাদ, তাদের সাংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন এবং অধঃপতিত সমাজ চরিত্রের উপরও সমালোচনা করতে হবে। এইভাবে যাতে করে পরাধীনতার তমশাচ্ছন্ন রাতের নিদ টুটে যায় এবং পরাভব কমে যায় এবং নিজের তাহযীব ও তমদ্দুনের উপর আস্থা বিশ্বাস বাড়ে। মুনাফেকী এবং দ্বৈত নীতির উপর সমালোচনার তীব্র তীর বর্ষণ করতে হবে যেন যে মুসলমান হয়ে থাকতে চায় সে যেন একজন পরিপূর্ণ মুসলিম হয়। অন্য দিকে যে অন্য জীবন বিধানসমূহের সাহায্যকারী হতে চায় সে যেন পর্দার আড়ালে নিজেকে ঢেকে রেখে অন্যদের ধোকা দিতে না পারে। এইভাবে যেসব লোক দীনের ব্যাপারে প্রকাশ্যে আমানতের খেয়ানত করেছে তাদের জ্ঞানগত হীনতা চারিত্রিক দুর্বলতাকে উম্মোচিত করা হোক যাতে তারা তাদের প্রকৃত স্বরূপ মানুষের সামনে উম্মোচিত হয়।

গ. এই ইলমে কালামে প্রকৃতিগত ভাবেই জ্ঞানের উৎসের সাথে সংলাপ ও কথোপকথনকে একটি বিশেষ মর্যা দা দেয়া হয়েছে। ইউরোপের আসল দাবীই হলো অহী হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় বস্ত্ত। মানুষের বুদ্ধিমত্তা জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতাই সভ্যতা সংস্কৃতির ভিত গঠনের জন্য যথেষ্ট। পক্ষান্তরে ইসলামের দাবি হলো বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা তখনই লাভজনক হবে যখন ওহীর আলোকে তা কাজে লাগানো হবে। নইলে আলো যতই থাকুক না কেন বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা বাস্তবতার কোন কিছুই দেখতে পায় না। যেমন- মানব চক্ষু অন্ধকারে কিছুই দেখে না। ওহীর রোশনাই হলো পবিত্র কুরআন শরীফ। [এই আধুনিক ইলমে কালামে ওহী, বুদ্ধি-বিবেক এবং অভিজ্ঞতার যথাযথ মর্যা দা তুলে ধরবার চেষ্টা করা হয়েছে। অতপর আধুনিকতা ও উত্তর আধুনিকতার জ্ঞান বিজ্ঞানের ব্যাপারে এটা পরিষ্কারভাবে বলে দেবার চেষ্টা করা হয়েছে যে, ওসবের ক্ষেত্র সীমা পরিসীমা কতটুকু।]

ঘ. এই ইলমে কালাম যুক্তি উপস্থাপনায়ও যে পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে তা মানব অন্তরের সুমতির নিকট কেন্দ্রীয় গুরুত্বের দাবী রাখে। তাফহীমুল কুরআনে পদে পদে মানব অন্তরের এই সুমতির কাছে নিবেদন করা হয়েছে এবং চেষ্টা করা হয়েছে। এটাই হলো আল-কুরআনের দলিল প্রমাণাদি উপস্থাপনের এক অনুপম পদ্ধতি।
আধুনিক ইলমে কালামে এই যুক্তি প্রদান পদ্ধতিই অবলম্বন করা হয়েছে।

ঙ. আল কুরআনের অনুসৃত যুক্তি উপস্থাপনের একটি অন্যতম মূলনীতি হচ্ছে সে বিরুদ্ধবাদীদের গৃহীত মূলনীতি ও স্বীকৃত জ্ঞান দ্বারাই তাদের নিরুত্তর তথা লা-জবাব করে দেয়া। [উপমা স্বরূপ হযরত ইবরাহিম আ. এর জাতিকে উদ্দেশ্য করে জাতির সদস্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হয়েছে তোমরা যে বড় সাইজের মূর্তিকে তোমাদের মাবুদ এবং সকল কাজের কারিগর হিসেবে জানো ও মানো তার ব্যাপারে এটা মানতে রাজী নও কেন? যে, সে অন্য ছোট ছোট মূর্তিকে ভেঙে ফেলেছে।]
আধুনিক ইলমে কালামে পাশ্চাত্যের সমালোচনা করার সময় সামগ্রিকভাবে এই পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। তাফহীমুল কুরআনে এর নেহায়েত উচ্চাংগের সুনির্বাচিত উপমা দেখা যায়।

চ. তাফহীমুল কুরআন যে নয়া ইলমে কালামের প্রবর্তন করেছে সেখানে ইসলামী আইন প্রণয়নের কৌশল, যুগের মাসলা-মাসায়েলের সমাধান ও অন্যান্য আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতি ও প্রসারকে তুলনামূলক পরযা্ লোচনা হিসেবে নিয়ে আসা হয়েছে। এই বস্ত্ত একদিকে কুরআনের প্রদর্শিত শিক্ষাসমূহের উপর আস্থা ও বিশ্বাসকে বাড়িয়ে তোলে অন্যদিকে খোদায়ী কালাম হিসেবে কুরআনের পক্ষে দলিল যা কিনা একথাটি প্রমাণ করে যে কুরআনী শিক্ষার মানদন্ডের উপর যুগের উত্থান-পতন কিংবা অতি বিপ¬বী চিন্তার কোন প্রভাবই পড়ে না। কুরআন বিংশ শতাব্দীতেও অতটাই তরতাজা এবং অত্যাধুনিক যতটা ছিল সপ্তম খৃষ্টাব্দে।

ছ. আল কুরআনের বর্ণনা পদ্ধতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো অন্তর ও দৃষ্টির প্রশান্তির সাথে সাথে প্রতিটি পদক্ষেপে নফসের পরিশুদ্ধির চেষ্টা করা হয়েছে যেন ব্যক্তিত্ব সুগঠিত হয় এবং ব্যক্তির কাঙ্ক্ষিত মানোন্নয়ন হয়। তাফহীমুল কুরআনে খোদ এই পদ্ধতিরই অনুসরণ করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতেই তাফহীম (মর্মবাণী বুঝা) ও তাযকিয়ায়ে নফস (আত্মার পরিশুদ্ধি) প্রতিটি পদে যুগপৎ এগিয়ে গেছে। অর্থাৎ এই ইলমে কালামের মূল লক্ষ্য বিন্দু ইমান ও নেক আমল। এই দুটো বস্ত্তকে পরস্পরের সাথে প্রতি পদক্ষেপে জুড়ে দেবার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে; যেন চেতনার যে ধাবমান ধারা ধমনীতে ধ্বনি তোলে তাই যেন শাণিত বহমান অশ্রম্ন বিন্দু হয়ে গন্ড বেয়ে টপকে পড়ে। আধুনিক তথা নয়া ইলমে কালাম শিরোনামায় উপরে যা আলোচিত হলো এইসব তাফহীমুল কুরআনে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।