তাফহীমুল কুরআন : একটি বিপ্লবী তাফসির - ষষ্ঠ পর্ব
মূলঃ প্রফেসর খুরশীদ আহমদ, অনুবাদঃ সাইয়েদ রাফে সামনান

প্রয়োজন মতো এসব বিষয়ের আলোচনা করার পর কুরআন সবসময় অপ্রয়োজনীয় বিস্তারিত আলোচনা বাদ দিয়ে নিজের উদ্দেশ্য ও কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়ের দিকে ফিরে এসেছে। একটি সুগভীর ঐক্য ও একাত্মতা সহকারে তার সমস্ত আলোচনা ‘ইসলামী দাওয়াত’-এর কেন্দ্রবিন্দুতে ঘুরছে। (কুরআনের মর্মকথা পৃ: )
আল-কুরআনের বর্ণনা পদ্ধতির এই নান্দনিক আবিষ্কার তাফহীমুল কুরআনের এক অনন্য কীর্তি। সাইয়েদ মওদূদী রহ. তার আলোচনায় যথাসম্ভব পরিভাষাগত জটিল শব্দ ব্যবহার পরিত্যাগ করেছেন কিন্তু তার রচিত তাফসীর এক অনন্য স্বতন্ত্র স্বাচ্ছন্দ্য পরিভাষার জন্ম দিয়েছে। তাফহীমুল কুরআনে প্রত্যেক সূরার বিষয়বস্ত্ত, মূল বক্তব্য ও আয়াতসমূহের বক্তব্যকে আল-কুরআনের মূল লক্ষ্য ও দাওয়াত হতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতুৎপন্নমতিময় দ্রুততার সাথে বের হতে থাকে।

অতঃপর এটা তাফহীমুল কুরআনের এক অনবদ্য কীর্তি যে এই তাফসির শুধুমাত্র আল কুরআনের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিই দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি বরং কুরআনের এই নান্দনিক সংযোগকে প্রতিটি সূরা এবং কুরআনের সূরাসমূহের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। তাফহীমুল কুরআনের সূরাসমূহের ভূমিকার আলোচনা এক্ষেত্রে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী এবং টীকাসমূহের জ্ঞানগর্ভ বিশে¬ষণেও কুরআনের সেই নান্দনিকতা তাৎপর্যপূর্ণভাবে ফুটে উঠেছে।

৩. তরজমায়ে কুরআন (তাফহীমুল কুরআনের অনুবাদ রীতি) : তৃতীয় যে বিষয়টি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা হলো তাফহীমুল কুরআনের তরজমায়ে কুরআন। অর্থাৎ তাফহীমুল কুরআনে কৃত আল কুরআনের অনুবাদ। এই অনুবাদ বিভিন্ন দিক হতে স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের অধিকারী। শাব্দিক তরজমার পথ পরিহার করে তাফহীমুল কুরআনে স্বতন্ত্র ও স্বচ্ছন্দ ভাবানুবাদের একটি পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো কোন একটি ক্ষেত্রেও এই স্বচ্ছন্দ অনুবাদ কর্ম অনুবাদের সীমা অতিক্রম করে যায়নি। এই অনুবাদ ছন্দবদ্ধ কাব্যিক অনুবাদের থেকেও ভিন্নতর বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। কাব্যিক অনুবাদে তো একটি আয়াতকে একক ধরে অুনবাদ করা হয়ে থাকে, এতে ভাব বর্ণনার ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখা কঠিন হয়ে যায়। আমার জানামতে তাফহীমুল কুরআনেই সর্বপ্রথম ধারাবাহিক স্বচ্ছন্দ অনুবাদ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে শুধুমাত্র অনুবাদ অধ্যয়ন করলেই পাঠকের দেহমনে সেই প্রভাব বিস্তৃত হয় যা কুরআন সৃষ্টি করতে চায়। এই স্বচ্ছন্দ অনুবাদে সেই বাণী শোনা যায় যা কুরআন বলতে চায়।

তাফহীমের অনুবাদের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এখানে বক্তৃতার ভাষা লেখনীর ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে- ফলে একটি উৎকৃষ্ট অনুবাদ কর্মের সাথে সাথে এটা কুরআনী জ্ঞান চর্চার নতুন এক মাইল ফলক উন্মোচন করেছে। তাফহীমুল কুরআনের তরজমাতে বক্তৃতার ভাষাকে সাহিত্যের ভাষায় রূপান্তরে মাওলানা মওদূদী র. অর্থের গুরুত্ব বিচারে প্যারাবদ্ধ করেছেন। এই পদ্ধতিতে বয়ানের সিলসিলার সাথে সাথে একটি বিষয় হতে অন্য বিষয়ে যাবার সংকেত ও নির্দেশিকাও দিয়ে দেয়া হয়েছে।

তরজমাতে প্যারাগ্রাফ পদ্ধতি একটি বিপ¬বী ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ছিল। কুরআন তরজমাতে প্যারাগ্রাফ পদ্ধতি সেসময় একটি বিপ¬বী বৈশিষ্ট্যের অধিকারী করে তাফহীমকে। এর ফলশ্রুতিতে কুরআনের অর্থ বোঝা এবং বাণী হৃদয়ঙ্গম করা আরও সহজতর হয়েছে। বক্তৃতার সময় যে কাজ বিরতি প্রদান, শ্বাস-প্রশ্বাস, কণ্ঠস্বর উঁচুনিচু করে করা হয়, তাই লেখার সময় বিরাম চিহ্নসমূহ দিয়ে করা হয়েছে। অতঃপর ভাব অনুযায়ী তা প্যারাতে আবদ্ধ করা হয়েছে। এই কাজ তাফহীমুল কুরআনে প্রথমবারে মতো করা হয়েছে। সম্ভবত : তাফহীমের পূর্বে পৃথিবীর অন্য কোন তাফসীরে অথবা অন্য কোন ভাষায় কুরআনের জন্য এ খেদমত করা হয়নি। এই বিচারে এটি তাফহীমুল কুরআনের একটি অনন্য গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

৪. সূরাসমূহের ভূমিকা : তাফহীমুল কুরআনের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সূরাসমূহের ভূমিকাও অন্যতম। প্রতিটি সূরার তাফসীর ও তরজমা শুরু করবার পূর্বে এর রচয়িতা সংশ্লিষ্ট সূরার ঐতিহাসিক পটভূমি, কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়, বিষয়বস্ত্ত ও মূল বক্তব্য তুলে ধরেছেন। সূরাসমূহের কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় এবং বিষয়বস্ত্তর সম্পর্ক ও ধারাবাহিকতাকে কুরআনের সম্মিলিত লক্ষ্যবিন্দু, কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় এবং কুরআনের মূল দাওয়াতের সাথে সম্পর্কিত করে বর্ণনা করা হয়েছে। নাযিল হওয়ার সময়কাল ও নাযিল হওয়ার উপলক্ষকে কেন্দ্র করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা করে তার চমকপ্রদভাবে বিবৃত করা হয়েছে। আমাদের জানামতে ইতোপূর্বে সূরাসমূহের ভূমিকার দ্বারা কুরআনের অর্থ বোঝানোর জন্য এমন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কেউ অবলম্বন করেননি কিংবা সমগ্র কুরআনের ব্যাপারেও এই পদ্ধতি কেউ অবলম্বন করেননি।

৫. আহকামে কুরআন : তাফহীমুল কুরআনের আরও একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর মধ্যে বর্ণিত ফিকহী নির্দেশসমূহ। কুরআনের যে আয়াত হতে কোন নির্দেশ পাওয়া গেছে তা সেখানেই তথা যথাক্রমিক স্থানেই বলে দেবার চেষ্টা করা হয়েছে। তাছাড়া অন্য যে সমস্ত জায়গায় একই বিষয় আলোচিত কিংবা বর্ণিত হয়েছে তাও বলে দেয়া হয়েছে। এইভাবে তাফহীমুল কুরআনে কুরআনের তাফসীর করার চেষ্টা করা হয়েছে খোদ কুরআন হতেই। আরও যে বিষয়টির প্রতি বিশেষভাবে খেয়াল রাখা হয়েছে তা হলো প্রতিটি বিষয়ে কুরআনের মূল শিক্ষা এবং কুরআন প্রদর্শিত চরিত্রনীতি ও সংস্কৃতির মৌলিক অবকাঠামোর আলোকে বিষয় বিবরণী ও নির্দেশনা দেয়া হোক। সাথে সাথে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর অবস্থান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হোক। নবী করীম সা. ও সাহাবায়ে কেরাম (র.) কোন আয়াত কিংবা নির্দেশের যে তা’বীর ও ব্যাখ্যা করেছেন তাফহীমুল কুরআনে তাও বিবৃত করবার চেষ্টা করা হয়েছে। যেখানে সাহাবাদের মধ্যে অথবা আলেমদের মাঝে মতভেদ দেখা দিয়েছে তাও বিবৃত করা হয়েছে; সাথে সাথে মতভেদের ভিত্তিও বলে দেবার চেষ্টা করেছে তাফহীমুল কুরআন। সাধারণভাবে কোন ব্যাখ্যায় হানাফী চিন্তাধারার আলোকে মূল ব্যাখ্যা করা হলেও অন্যদের দৃষ্টিকোণও তুলে ধরা হয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ হতে তাফহীমুল কুরআনে ফিকহী মাযহাবসমূহের মতামতের যে তুলনামূলক পর্যালোচনা করা হয়েছে তা আগামী দিনের গবেষকদের জন্য অত্যন্ত সাহায্যকারী উপাদান ও ফলপ্রসূ হতে পারে। সাথে সাথে সম্মিলিতভাবে উম্মতের ঐক্য ও সম্প্রীতি স্থাপনেও নতুন পথের সূচনা করবে।