তাফহীমুল কুরআন : একটি বিপ্লবী তাফসির - পঞ্চম পর্ব
মূলঃ প্রফেসর খুরশীদ আহমদ, অনুবাদঃ সাইয়েদ রাফে সামনান

অন্যান্য বৈশিষ্টাবলী
এখন আমরা তাফহীমুল কুরআনের অন্যান্য কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করবো। অন্যান্য বৈশিষ্ট্যসমূহ মূল বৈশিষ্ট্যের সাথে এমন সাদৃশ্যপূর্ণ যেমন মূল থেকে কান্ড শাখা-প্রশাখা, পত্র-পল্লব, ফুল-ফল, সুশোভিত হয়।
১. সরাসরি সম্পর্কের সূচক: এই তাফসির গ্রন্থে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে চেষ্টা করা হয়েছে যেন পাঠক সরাসরি পবিত্র কুরআনের সাথে সম্পর্ক জুড়ে নেয়। ভূমিকা, তরজমা এবং টীকাসমূহ এই সম্পর্কের সেতুবন্ধন। প্রতিটি সূরার তাফসীরের সূচনায় ভূমিকার আলোচনায় সূরাটির বিষয়বস্ত্ত ও মূল বক্তব্য পেশ করা হয়েছে। অনুবাদ দ্বারা কুরআনের বক্তব্য উপস্থাপিত হয়েছে। টীকাসমূহে সাধারণত আয়াতের বক্তব্যকে সুস্পষ্ট করেছে, ঐতিহাসিক তথ্য উপাত্ত তুলে ধরা হয়েছে, আবার কুরআনের অন্যান্য স্থানে আলোচ্য বিষয়টির যোগসূত্র এবং কোথাও কোথাও বক্তব্যও তুলে ধরেছে। এই যোগসূত্র তুলে ধরবার মূল কারণ হলো যেন পাঠক চলমান বক্তব্য হতে দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় সমস্যার সমাধান, দাওয়াতের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে পেরে সন্দেহ ও সংশয়মুক্ত হতে পারেন। সার্বিকভাবে এই টীকাসমূহ সুবিন্যস্ত ও সংক্ষিপ্ত কিন্তু ব্যাপক অর্থবোধক। আবার এই টীকাসমূহ প্রতিটি ক্ষেত্রে কুরআনের মূল বক্তব্য এবং কাঙ্ক্ষিত প্রাণশক্তিকে বজায় রেখেছে।

তাফহীমুল কুরআনে প্রথাগত বাহাস নেই বললেই চলে। এই কিতাব পুরোপুরি ইসরাইলিয়াতমুক্ত। অতীতে আলোচিত বাহাস ও কালামী বাহাস হতেও মুক্ত এই তাফসির গ্রন্থ। ফিকহি বাহাসও এখানে সীমাবদ্ধ। জাতিগোষ্ঠীগত সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে কুরআনের আদেশ এবং নির্দেশসমূহের বিবরণ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এখানে। তাফহীমুল কুরআনের ভূমিকায় উসুলে তাফসিরের প্রথাগত বাহাস বা পর্যালোচনার কোন সূত্র পাওয়া যায় না। তাফহীমে কেবলমাত্র শানে নুযুলের বর্ণনা এসেছে একটি ভিন্ন মাত্রায়। এখানে নাসেখ ও মানসুখের বাহাস নেই, মুহকাম ও মুতাশাবেহ আয়াতের বিতর্ক নেই, না আছে এজাযে কুরআনের বাহাস। ইমসাল (উপমাসমূহ), ইক্বসাম (প্রকারভেদ) এবং কাসাসে কুরআন (কুরআনের কিস্সাসমূহ) নিয়েও তেমন বাহাস পর্যালোচনা নেই। তবে আবার এমন নয় যে তাফহীমুল কুরআনে এসব একেবারেই নেই। সকল জরুরি এবং প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ নিজ নিজ স্থানে তথা যথাস্থানে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু তাফসিরে কুরআনের মৌলিক দৃষ্টিকোণকে হালকা করে দেখা হয়নি। বরং এক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে আল কুরআনের বিষয় বস্ত্ত, মূলবক্তব্য, কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় এবং তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরবার জন্য। সাথে সাথে কুরআন পাঠকের হৃদয় মনে এমনভাবে গেঁথে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যার দ্বারা এক নতুন মানুষ এবং একটি নতুন মানব সভ্যতা বিকশিত হতে পারে। যেমন সভ্যতা ও মানব সমাজ আল কুরআন দেখতে চায়। এজন্য তাফহীমুল কুরআনের রচয়িতা বিভিন্ন বাহাস বা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার চেয়ে নিজের শ্রম ও মেহনত কুরআনের মৌলিক বিষয় ও পরিভাষাসমূহ পরিষ্কারভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরার পেছনে ব্যয় করে গেছেন।

২. নাযমে কুরআন বা কুরআনের নন্দনতত্ত্ব : তাফহীমুল কুরআনের দ্বিতীয় অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নাযমে কুরআনের এক নয়া ধারণা। নাযমে কুরআন তাফসীর শাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হিসেবে স্বীকৃত। বিজ্ঞ মুফাস্সেরীনে কেরাম ব্যাপকভাবে সূরাসমূহের পারস্পরিক মিল ও ধারাবাহিক সংযোগের উপর বেশি জোর দিয়েছেন। কুরআনের কিছু মহান খাদেম আবার আয়াতসমূহের ধারাবাহিক মিল ও পারস্পরিক অন্ত মিলের বিষয়টি তুলে ধরবার চেষ্টা করেছেন। মুফাস্সিরগণের অন্য একটি দল সমগ্র সূরাকে এক একক ধরে সূরার ভেতরের সব আয়াতকে একটিই মৌলিক বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন এবং সেখান হতেই সূরার সকল বিষয়বস্ত্ত ও আলোচ্য বিষয়কে বের করে এনেছেন।

তাফহীমুল কুরআনে উপরে আলোচিত সব বিষয়েরই ঝলক পাওয়া যায়। তবে এগুলোর মধ্য হতে নন্দনতত্ত্ব, নান্দনিকতা ও অলংকার শাস্ত্রের সকল সূত্রকে ছাপিয়ে যে বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তা হলো কুরআনের বিষয়বস্ত্ত, এর কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় এবং লক্ষ্যবিন্দুর সাথে প্রত্যেকটি সূরা এবং প্রতিটি আয়াতকে সম্পর্কিত ও সংযুক্ত করা হয়েছে। তাফহীমুল কুরআনে দেখানো হয়েছে ‘‘এই কিতাবটি (অর্থাৎ কুরআন) তার সমগ্র পরিসরে কোথাও তার বিষয়বস্ত্ত, কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় এবং মূল লক্ষ্য ও বক্তব্য থেকে এক চুল পরিমাণও সরে পড়েনি। প্রথম থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত তার বিভিন্ন ধরনের বিষয়াবলী তার কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়ের সাথে এমনভাবে সংযুক্ত আছে যেমন একটি মোতির মালার বিভিন্ন রংয়ের ছোট বড় মোতি একটি সূতোর বাঁধনে এক সাথে একত্রে একটি নিবিড় সম্পর্কে গাঁথা থাকে। কুরআনে আলোচনা করা হয় পৃথিবী ও আকাশের গঠনাকৃতির, মানুষ সৃষ্টির প্রক্রিয়া পদ্ধতি এবং বিশ্ব-জগতের নিদর্শনসমূহ পর্যবেক্ষণের ও অতীতের বিভিন্ন জাতির ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর। কুরআনে বিভিন্ন জাতির আকীদা-বিশ্বাস, নৈতিক চরিত্র ও কর্মকান্ডের সমালোচনা করা হয়। অতি প্রাকৃতিক বিষয়াবলীর ব্যাখ্যা করা হয়। এই সাথে অন্যান্য আরো বহু জিনিসের উল্লেখও করা হয়। কিন্তু মানুষকে পদার্থ বিদ্যা, জীব বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন বা অন্য কোন বিদ্যা শিক্ষা দেয়ার জন্য কুরআনে এগুলো আলোচনা করা হয়নি। বরং প্রকৃত ও জাজ্জ্বল্যমান সত্য সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারণা দূর করা, যথার্থ সত্যটি মানুষের মনের মধ্যে গেঁথে দেয়া, যথার্থ সত্য বিরোধী কর্মনীতির ভ্রান্তি ও অশুভ পরিণতি সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা এবং সত্যের অনুরূপ ও শুভ পরিণতির অধিকারী কর্মনীতির দিকে মানুষকে আহবান করাই এর উদ্দেশ্য। এ কারণেই এতে প্রতিটি বিষয়ের আলোচনা কেবলমাত্র ততটুকুই এবং সেই ভঙ্গিমায় করা হয়েছে যতটুকু এবং যে ভঙ্গিমায় আলোচনা করা তার মূল লক্ষ্যের জন্য প্রয়োজন।