তাফহীমুল কুরআন : একটি বিপ্লবী তাফসির - চতুর্থ পর্ব
মূলঃ প্রফেসর খুরশীদ আহমদ, অনুবাদঃ সাইয়েদ রাফে সামনান

এই কিতাব সৃষ্টিজগত, মানব সমাজ, মানবজীবন- ইত্যাদি সম্বন্ধে একটি ভিন্নতর ধারণা পেশ করে। যারা এই ধারণা তথা মতাদর্শকে মেনে নেয়, তাদের জীবনধারাকে সে এক ভিন্নধারায় গড়ে তোলে। অন্য দিকে যারা একে বর্জন করে তাদের সাথে অনবরত চেষ্টা সাধনা, মোকাবিলা, দাওয়াত ও তাবলীগের ক্রমধারা চালাতে থাকে। কুরআনকে একটি দাওয়াতের কিতাব হিসেবে মেনে নিলে এমন এক মাস্টার কী হাতে হাতে চলে আসে যা দ্বারা কুরআন বুঝার ক্ষেত্রে সকল বাধা বিপত্তি সমস্যা দূরীভূত হয়ে যায়।

অতঃপর কুরআনের নিজস্ব পদ্ধতি ও স্টাইল, এর যুক্তি প্রদর্শন রীতি, এর নন্দনতত্ত, এর সাহিত্য, এর বিষয়বস্ত্তর অনুপম ধারাবর্ণনা, এর আলোচ্য বিষয়ের উপস্থাপনা, এর চরিত্র গঠনের শিক্ষাসমূহ, এর আইন প্রণয়ন বিধি, এর ঐতিহাসিক ঘটনা বিশে¬ষণ তথা আল কুরআনের আলোচ্য সবকিছুই বুঝে এসে যায় এবং জীবন পথে চলতে গিয়ে পাঠক কুরআনকে নিজের প্রকৃত মশালচী হিসেবে অনুভব করতে পারবে। যদি কোন মানুষ এই বিশ্বাস এবং মনোভাবের সাথে আল কুরআন বুঝবার চেষ্টা করে এবং এই মহাগ্রন্থের হেদায়েত অনুযায়ী নিজের এবং অন্যান্য মানুষের জীবন প্রণালী পরিবর্তনের সংগ্রাম সাধনার পথে অগ্রসর হয় তাহলে কুরআনের লিখিত আয়াতসমূহ তার জীবনে আর গ্রন্থগত বিদ্যা হয়ে থাকবে না; আল কুরআনের আয়াত তার বাস্তব জীবনের আয়াত এবং কর্মপদ্ধতিতে রূপান্তরিত হবে। কুরআনের এই পাঠক নিজের অজান্তেই অনুভব করবেন জীবনের পথে প্রতিটি পদে পবিত্র পথের প্রদর্শক পাঠককে পথ প্রদর্শন করছেন। মহাকবি আল্লামা ইকবাল কুরআনের এই পাঠক মুমিন ব্যক্তির অবস্থান এবং পরিচয় তুলে ধরে বলেছেন :
ক্বারী নযর আতা হ্যায়, হাকীকাত মে হে কুরআন
অর্থ : দৃশ্যত ক্বারী, বাস্তবে কুরআন।

ইমাম মওদূদী র. তার রচনায় এক জায়গায় লিখেছেন ‘‘কুরআনকে এমনভাবে অধ্যয়ন করো যেন মনে হয় এটা তোমার ক্বলবে সরাসরি অবতীর্ণ হচ্ছে। এভাবেই আল কুরআন মা’রেফাতে এলাহীর উৎসে পরিণত হয়, দাওয়াতে ইসলামী মূল চালিকা শক্তি বনে যায়। ইসলামী আন্দোলনের সার্বজনীন ইশতেহারে রূপান্তরিত হয় এবং ইসলামী বিপ¬বের চার্টারে পরিণত হয়ে জীবনের ধারাকে শান্তি ও কল্যাণের দিকে ফিরিয়ে দেয়।

তাফহীমুল কুরআন, কুরআনের এই বিপ¬বী মিশনের দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এটা কোন নতুন বা অভিনব কথা নয় যে, মাওলানা মওদূদী রহ. প্রথম বলেছেন এবং পূর্বেকার মুফাস্সির ও ইসলামী চিন্তাবিদগণ তাদের তাফসীর কিংবা লেখনীতে কথাটি বলেননি। বরং যে কথা তাফহীমূল কুরআনে মোটা দাগে তুলে ধরা হয়েছে তা হলো পুরো কুরআন মজিদ অধ্যয়নকালে এই দৃষ্টিকোণটি সবচাইতে আলোকিত হয়। কোথাও কোন কোন সীমিত বা সীমাবদ্ধ আইডিয়া এসে এই আলোকিত সরল পথ থেকে পাঠককে বিচ্যুত করতে পারে না। এই তাফসিরকারী ও কুরআনের অবতীর্ণ হবার লক্ষ্য পথের মাঝে একের পর এক দেয়াল তুলে দেয় না বরং একের পর এক দ্বারোদঘাটনের মাধ্যমে কুরআন ও ক্বালবের মধ্যকার অচলায়তনগুলো মুছে ফেলে দিয়ে হৃদয় মনকে একচ্ছত্রভাবে মূল লক্ষ্যের দিকে দূর্বার গতিতে এগিয়ে নিয়ে যায়।

তাফহীমুল কুরআনের শানে নুযুল প্রসঙ্গ :
এই দৃষ্টিকোণ হতে তাফহীমুল কুরআনের শানে নুযুল অংশ অত্যন্ত দারুণভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সাহেবে তাফহীমুল কুরআন (তাফহীমুল কুরআনের রচয়িতা) চেষ্টা করেছেন কুরআন পাঠকের সামনে সেই দৃশ্য তুলে ধরবার যে প্রেক্ষিতে একটি সূরা বা তার কোন অংশ নাযিল হয়েছিল। যাতে পাঠক জানতে পারেন ইসলামী দাওয়াত ও আন্দোলন তখন কোন পরিস্থিতির মুখোমুখি ছিলো অথবা হচ্ছিল। আন্দোলন তখন কী ধরনের সমস্যা সমাধানে নিয়ত ছিল। কী ধরনের উপায় উপকরণ ও সম্পদ তাদের করায়ত্ত ছিল এবং কী ধরনের বিপদ মুসীবত তাদের উপর আপতিত হচ্ছিল। এমত পরিস্থিতিতে আল কুরআন তাদের কি দিক নির্দেশনা দিয়েছিল? এবং এই নির্দেশনা প্রত্যেক যুগে বিশেষভাবে আমাদের যুগে কী ধরনের গুরুত্ব বহন করে কিংবা সে ঘটনার সাথে আমাদের যুগের কী সাদৃশ্য রয়েছে? তাফহীমুল কুরআন কেবলমাত্র কুরআনের জীবনদর্শনেরই মুফাসসির নয় বরং এতে আম্বিয়ায়ে কেরামের জীবন ও ইতিহাস আলোচিত হয়েছে। বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে শেষনবী নবী করীম সা. এর দায়ী ইলাল্লাহ হিসেবে জীবন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহে ওয়া সাল্লাম এর নেতৃত্বে এবং ইমামতিতে চলমান ইসলামী আন্দোলনের জীবন্ত ইতিহাস। সীরাতে সরওয়ারে আলম সা. আলোচনার এক মহান বৈশিষ্ট্য তাফহীমুল কুরআনের অন্যতম কীর্তি। উপরে আমরা তাফহীমুল কুরআনের যে দুটি বুনিয়াদী বৈশিষ্ট্য আলোচনা করলাম এ দুটি বৈশিষ্ট্য একটির পর একটি তাফহীমে নতুনভাবে এবং নব সাজে বিন্যস্ত। সাথে সাথে এ দুটি বৈশিষ্ট্যের একই সাথে একটি তাফসিরে সম্মিলন সত্যি অতুলনীয়। এজন্যই আমাদের তাফসির সাহিত্যে তাফহীমুল কুরআন এক অনুপম আকর এবং ইতিহাসের তাফসিরী বর্ণনাসমূহের ধারাবাহিকতার উজ্জ্বল সংরক্ষক এবং তাফহীম নিজস্ব স্বকয়িতায় সমুজ্জ্বল তথা নিজ শক্তিতেই প্রাণচঞ্চল। যেন : সাবকে দারমেয়ান সাবসে আলাগ
অর্থ : সবার মাঝে অভিনব।

তাফহীমুল কুরআনের এ দুটি বুনিয়াদী বৈশিষ্ট্য অন্যতম এবং গুরুত্বপূর্ণ। একারণে একটি তাফসির সাহিত্য হিসেবে তাফহীম যে গুরুত্বের দাবি রাখে তা তার স্বীয় মর্যাদার দাবি। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে এর মূল গুরুত্ব কুরআনের উপর গুরুত্ব প্রদান এবং সেই আলোকের সন্ধান করা যার আলোকে কিতাবুল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক স্থাপিত হওয়া উচিত। এ গ্রন্থ তাফসিরের চাইতে বেশি কুরআন বোঝার একটি পথের দর্শন দিয়ে যায়, অসম্ভব নয় যে এজন্যই রাববুল কুরআন তাফহীমের রচিয়তার দিলে হয়তো এর নামের ব্যাপারে এ কথাটি উৎপন্ন করে দিয়ে ছিলেন যে এ কিতাবের নাম রাখা উচিত তাফহীমুল কুরআন (কুরআনের মর্মবাণী)। এজন্যই আমরা হৃদয়মনে এ আশা পোষণ করি যে, তাফহীমুল কুরআন আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যতম তাফসীর সাহিত্যসমূহের প্রতি আমাদের বিরাগভাজন বা নিরুৎসাহিত করে না বরং ঐ তাফসীরসমূহ পর্যন্ত পৌঁছতে আমাদের তৈরি করে দেয়। এর দ্বারা আল কুরআনের একজন তালেবে ইলমের (ছাত্র) এক ধরনের দূরদৃষ্টি তৈরি হয়ে যায়। এরপর সে তাফহীমুল কুরআনের সাথে সাথে সমগ্র তাফসীর সাহিত্য হতে পরিপূর্ণ ফায়দা হাসিল করতে পারে এবং অতীতের জ্ঞান ভান্ডারের দুয়ার নিজের তরে নিজ উঠানে খুলে নিয়ে নিজেকে মেলে ধরতে পারে।