তাফহীমুল কুরআন : একটি বিপ্লবী তাফসির - তৃতীয় পর্ব
মূলঃ প্রফেসর খুরশীদ আহমদ, অনুবাদঃ সাইয়েদ রাফে সামনান

তাফহীমুল কুরআনের দুটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য :
সন্দেহ নেই দীনের যে খেদমত তাফহীমুল কুরআন করেছে এবং করে যাচ্ছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক ভূমিকার দাবি রাখে। শুধু এজন্যই নয় বরং শুধুমাত্র জ্ঞানগত দৃষ্টিকোণ হতেও তাফহীমুল কুরআনের মর্যাদা অনেক উচ্চে। এটা সেই গ্রন্থগুলোর অন্তর্ভুক্ত যেসব শত শত বছর ধরে আলোর বর্ণচ্ছটা ছড়াতে থাকে। এ তাফসীর গ্রন্থ ইতিহাসের শুধু মাত্র একটি অংশ নয় বরং নিজ যুগের ইতিহাসের স্রষ্টাও বটে। আমরা এখানে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তাফহীমুল কুরআনের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করবো। বিশেষ করে যে দিক ও বিষয়গুলো তাফহীমুল কুরআনের মাঝে পাওয়া যায়।

সর্বপ্রথম আমরা দুটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করবো যা তাফহীমুল কুরআনের মেজাজ, রীতি, পদ্ধতি, বর্ণনাভঙ্গী, তাফসীর, বিষয়বস্ত্ত, মূল আলোচ্য বিষয়, পটভূমি, মূল বক্তব্য, সাহিত্য, বিষয় নির্দেশিকা তথা সকল কিছুকে প্রভাবিত করে মূলত এই ঐতিহাসিক তাফসীর গ্রন্থের বিচিত্র বর্ণনা কৌশল ও অনুপম উপস্থাপনা রীতিকে তুলে ধরে।

প্রথম মৌলিক কথা হলো তাফহীমুল কুরআনে যে দৃষ্টিকোণ হতে কুরআন পাকের আলোচনা করা হয়েছে তা বলে দেয় যে, এই কিতাব একটি ‘সহীফায়ে হেদায়েত’ বা হেদায়েত গ্রন্থ। একটি হেদায়েতের গ্রন্থ হিসেবে আল কুরআন প্রত্যেক ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে এবং পুরো জাতির মধ্যে চিন্তা-ভাবনা, গবেষণা, বিশেস্নষণ, অধ্যয়ন ও অনুশীলনের একটি বিশেষ ট্রেন্ড চালু করতে চায়। এই কিতাব মানুষের মাঝে একটি নতুন চেতনা জাগ্রত করে দেয়। দাসত্বের চেতনা জাগ্রত করে দেয় এবং ব্যক্তির মূল ব্যক্তিত্বের সনাতন দৃশ্যপট পাল্টে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করে এবং পাঠক সবকিছু নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শুরু করে দেয়। চিন্তা পদ্ধতি এবং দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সাথে সাথে এই হেদায়েত গ্রন্থ ব্যক্তিগত জীবন ও সামাজিক জীবন পুনর্গঠনের একটি পরিপূর্ণ রূপরেখা পেশ করে। এই কিতাব সিরাতুল মুস্তাকিমের একটি পরিষ্কার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে এবং সাথে সাথে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নীতিগতভাবে এবং গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে বিস্তারিতভাবে জরুরি দিক নির্দেশনা দান করে; যা সম্পর্কে আইন প্রণয়নে, নীতি-নির্ধারণে, সংবিধান রচনায় সর্বপ্রকার আচরণ বিধানে ও কার্যপ্রণালী গ্রহণে। এই দিক নির্দেশনা শুধুমাত্র নীতি আইন সম্পর্কিত বিষয়ই নয় বরং মানব জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগের আলোচনা এসেছে তাফহীমুল কুরআনে; ব্যক্তিগত জীবন হোক চাই সামাজিক জীবন, রাজনীতি কিংবা অর্থনীতি, শাসন-বিচার বা ব্যবসা-বাণিজ্য, দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে কৃষ্টি-কালচার, সর্বোপরি জাতীয় জীবন হতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পর্যন্ত। আর এভাবেই এই হেদায়েত গ্রন্থ ...... আল কুরআনুল করীম- যুগের যাবতীয় দাবি পূরণপূর্বক একটি পরিপূর্ণ জীবনযাপন প্রণালী পেশ করেছে। এই কিতাব একজন মানুষ তখনই বুঝতে পারবে এবং এর দাবিসমূহ পূরণ করতে পারবে যখন জীবনের সামগ্রিক বিষয়ের উপর দৃষ্টিপাত করে সে কুরআন প্রদর্শিত পথে নিজ জীবনের প্রবাহকে পরিচালিত করবার জন্য সংকল্পবদ্ধ হবে।

এমন নয় যে, এই কথাগুলো ইতোপূর্বে আর কেউ বলেনি। মূলত হেদায়েত গ্রন্থ হবার ধারণা প্রতিটি তাফসীর গ্রন্থেই পাওয়া যায়। একই সাথে পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হবার ধারণা অতীতেও ছিল এবং আধুনিক যুগের অনেক তাফসীর সাহিত্যিক তো তাদের রচনায় উলি¬খিত বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছেন। উপমাস্বরূপ তাফসীর আল-মানার এবং মাওলানা আবুল কালাম আযাদ রচিত তরজুমানুল কুরআন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ঐ দুটি তাফসীর গ্রন্থ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। অবশ্য এখানে চিন্তার বিষয় হলো একটি বিষয়ের উপর সাধারণভাবে বেশি গুরুত্ব দেয়ায় ঈড়সঢ়ষবঃব পড়ফব ড়ভ ষরভব হিসেবে ইসলামের উপস্থাপনটি পরিষ্কার হয়ে উঠেনি। কালামী তাফসীরের ছেয়ে ছিল আর আমরা তাফসীরে ইসারঈলি নিয়্যাত সমগ্র পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। আভিধানিক ও আদবী তাফসীরে সাধারণভাবে শব্দালংকার ও ভাষার অলংকারকে এতটাই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে যে শব্দের অর্থ মূল অর্থের স্থান দখল করে বসেছে। ফিকহী তাফসীরসমূহে এবং মাযহাব সমূহের বিতর্কের ফলে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যে ফুল ও চারাগাছ তো চোখে দেখা যায় কিন্তু বাগানবাড়ীর কোন অস্তিত্ব মিলে না। সুফী তাফসীরসমূহে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক বিষয় এবং আত্মার সংশোধন ও পরিশুদ্ধকরণের আবেগ এমনভাবে উঠে এসেছে যে জীবন বিধানের ধারণা তার মূল প্রবাহ হতে সটকে পড়েছে এবং দীনের ব্যাপ্যারে এক ধরণের রোমাঞ্চ জন্ম লাভ করতে শুরু করেছে। কিছু জামে তাফসির গ্রন্থে এইসব দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে সব কিছু একীভূত করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে এত বিশাল জ্ঞান ভান্ডার হতে একজন পাঠকের জন্য জীবনে পথ চলার পাথেয় খুঁজে খুঁজে তুলে আনা অসম্ভব না হলেও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। বস্ত্তত তাফসীর সাহিত্যসমূহে বিধানের বিষয়ে, হেদায়েতের বিষয়ে মূলত সবকিছুই আছে, তবে এগুলো সবকিছু এমনভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে যে তা হতে হেদায়েতের রসদ তুলে আনতে একজন মানুষকে পাকা জহুরী হতে হবে। তাফহীমুল কুরআন সাধারণ পাঠক এবং আলেম শ্রেণী, উভয়ের জন্য এই খেদমতই আঞ্জাম দিয়েছে।

দ্বিতীয় মৌলিক বৈশিষ্ট্য
তাফহীমুল কুরআনের বুনিয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবার দ্বিতীয় মৌলিক বৈশিষ্ট্য এখন আমরা আলোচনা করবো। এ বৈশিষ্ট্য হলো কুরআন পাক শুধুমাত্র একটি কিতাব, একটি ইলহামী কিতাব, একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ কিংবা স্রেফ একটি মহাগ্রন্থই নয়; বরং এর মৌলিক দাবি হলো এ গ্রন্থ আলস্নাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার পক্ষ হতে অবতীর্ণ চিরন্তন হেদায়েত বাণী; যা একটি দাওয়াতের দিকে আহবানকারী এবং একটি বিপ¬বী আন্দোলনের সূচনাকারী ...... এই মহাগ্রন্থ একটি দাওয়াতের দায়ী এবং এক মহান আন্দোলনের ডাক দিয়ে যায় ..... কুরআন একটি বাণীর নিশানবরদার এবং সেই দাওয়াত ও আন্দোলনের বিপস্নবী কণ্ঠস্বর। এই গ্রন্থ একটি আদর্শবাদী জাতি গঠন করে তার কাঁধের উপর একটি মিশন চাপিয়ে দেয়। এই দাওয়াত এবং আন্দোলনের জন্য কুরআন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, নীতি ও কর্মপদ্ধতি, আচরণবিধি এবং সর্বোপরি রোডম্যাপ পর্যন্ত বলে দেয়। এর জন্য সংগ্রামরত কর্মীদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনের রূপরেখা তক সে প্রণয়ন করে দেয়। এই কাজ করবার জন্য যেসব গুণাবলী যোগ্যতা জযবা এবং অনুভূতি দরকার হয় সে তা ওই সব মানুষের মাঝে পয়দা করে দেয়। এই মহাগ্রন্থ মানুষের ব্যক্তিজীবনে এবং সামষ্টিক জীবনেও এবং সর্বোপরি পুরো পৃথিবীতে একটি দ্বন্দ্ব ও সংগ্রামমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে ....... এই সংগ্রাম হক ও বাতিলের মধ্যে যেন জীবনের গতিধারা হকের পথে চলতে পারে এবং বাতিল যেন শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।